একজন সংসদ সদস্যের উত্পাদন-রাজনীতি

সত্তরের দশকের সেই কাছের লোকটি, সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলামের আজ মৃত্যুদিন। ২০১৯ সালের এইদিনে তিনি সকলকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন। তার গ্রামের বাড়ি চর লরেন্স, বৃহত্তর রামগতি থানার নোয়াখালী জেলায়। বয়স ৮৫। সত্তরের দশকে দৈনিক ইত্তেফাকের নোয়াখালী সংবাদদাতা এবং লরেন্স হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। নরম ভদ্র এ লোকটি। ১৯৬৪-৬৫ সময়কালে দুর্গম রামগতিতে সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত ইত্তেফাকের সিরাজ ভাই সভাপতি, পাকিস্তান অবজারভারের রুহুল আমিন ভাই সদস্য আর আমি দৈনিক পূর্বদেশের সেক্রেটারি। সবেধন এই তিন জন মিলেই সর্বপ্রথম রামগতি সাংবাদিক সমিতি গঠন করি। রামগতি সাংবাদিক সমিতি খুব সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে নাই। ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১২ নভেম্বর সত্তরের জলোচ্ছ্বাস, সব মিলে খুব দ্রুত পাকিস্তানি শোষকের শৃঙ্খল ভেঙে, গণতন্ত্র ও মুক্তির আশায় ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বীর বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ল।

অন্যদিকে ১২ নভেম্বর জলোচ্ছ্বাসের কারণে রামগতিসহ উপকূলীয় এলাকায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন পিছিয়ে দিল। নির্বাচনে সিরাজুল ইসলাম এমপি নমিনেশন পেয়ে এ ঝঞ্ঝাময় পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ এমপি নির্বাচিত হলেন। এমপি সাহেবের সঙ্গে পরামর্শে হাজিরহাট (চর জাঙ্গালিয়া) বাজারে বিএডিসির সেচ ইউনিট আওতায় লো-লিফ্ট পাম্প ক্যাম্প করা হয়। চর কালকিনি ইউনিয়নে এই প্রথম সমবায়ের মাধ্যমে একই সঙ্গে ৭২ ট্রাক্টর দিয়ে মিষ্টি পানি আবিষ্কার করে ইরি চাষ করা হয়।

সিরাজুল ইসলাম সাহেব মুক্তিযুদ্ধে ওপার বাংলায় গেলেন। কিন্তু বন্যা-উত্তর ধ্বংসলীলায় ত্রাণ, পুনর্বাসন ও উত্পাদন কাজে ‘ধ্বংস থেকে সৃষ্টি’ স্লোগান দিয়ে আমরা কৃষি, মত্স্য ও বিশ্বগ্রাম-গুচ্ছগ্রাম হাউজিং সমিতি গঠন করে উত্পাদন কাজে থানাব্যাপী ব্যাপৃত হলাম। একদিকে বন্যার ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘকাল চলতে পারে আশঙ্কায় প্রস্তুতিস্বরূপ উত্পাদন যুদ্ধের হাতিয়ার সমবায় সাংগঠনিক কৌশল ও রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনায় ঠিক হয় যে, আমাদের উত্পাদন কর্মকাণ্ড চালু রাখতে হবে। ’৭০-এর বন্যা-পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রচারণায় বঙ্গবন্ধুর আলেকজান্ডার (রামগতি) আগমন ও বটতলায় পথসভা করেন। বক্তব্য শেষে মাইক ছেড়ে দিতে দিতে বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, ‘কি নোমান, তুমি এখানে কী করো?’ আমি বললাম, ‘কৃষি ও মত্স্যজীবীদের নিয়ে সমবায় সমিতির মাধ্যমে কাজ করছি। এই পুকুরের দক্ষিণ পাড়েই আমাদের বাড়ি।’ ‘তা ভালো। ভোটের কাজ করো না?’ ‘জি, তা তো করিই।’ ‘কী সিরাজ, নোমান ভোটের কাজ করে না?’ সিরাজ ভাই হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন, ‘জি, অবশ্যই করেন।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। সমিতিও করো, ভোটও করো। এরপর জিপে উঠতে বন্যা-পরবর্তী ত্রাণ-পুনর্বাসন ফসল ফসলাদি এবং নির্বাচন বিষয়ক পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন।

১৯৭৩। বঙ্গবন্ধু তখন শেরেবাংলা নগরস্থ কার্যালয়ে বসেন। রামগতি থানা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা ও নির্বাচন। সমবায় নির্বাচন উপলক্ষ্যে উত্পাদন গতিধারা ও বাস্তবায়ন নীতি নিয়ে আমার সঙ্গে স্থানীয় দু-এক জন আওয়ামী লীগ নেতার মতপার্থক্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এমপি সাহেব আমাকেসহ ঢাকায় এলেন। সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওয়াহেদ মুরাদকে (বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি) নিয়ে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা শফিক কমান্ডার ও সমবায় ম্যানেজার নুরু খলিফাকে (চর লরেন্স) পরিস্থিতি মোকাবিলা পর্যবেক্ষণে রেখে আসেন। এমপি সিরাজ ভাই, মুরাদ ভাইসহ আমাকে নিয়ে গণভবনে গেলেন। গণভবনে গেট পার হয়ে ভেতরে কতটুকু গেলেই দেখি বিশালাকায় আমাদের জাতির পিতা তোফায়েল ভাইকে পাশে নিয়ে বীর শিরে ধীর হেঁটে ডান দিকের বিল্ডিং থেকে আর এক কক্ষের দিকে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু সিরাজ ভাইকে দেখে—কি রে সিরাজ! ভাই, আসছিলাম নোমান সাহেবকে নিয়ে। নোমানকে নিয়ে? কী হয়েছে? আমাদের ওখানে সমবায় নির্বাচন। ফজলু মিয়া (আওয়ামী লীগ থানা সভাপতি) ওনার বিপক্ষে প্রতিযোগিতা করতে চায়। বঙ্গবন্ধু, ‘তা সে রাজনীতি করে। নোমান সমবায় কাজকর্ম করে। ফজলু এখানে কেন? এই তোফায়েল, দেখ, নোমানের এটা ঠিক করে দাও।’ এরপর আর কী থাকে! বঙ্গবন্ধুর ঐ যে ‘নোমানের এটা ঠিক করে দাও বলা। আমার পাথেয় ও জীবন প্রাপ্তি দিক বাতলিয়ে দেওয়া। বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্নের অনুসারী হয়ে সিরাজ ভাইসহ এসব কর্মকাণ্ড ছিল উত্পাদন ও রাজনীতির পরস্পর সম্পূরক, পরিপূরক ও সহায়ক, যা বর্তমানে প্রায়ই অনুপস্থিত। ভিন্ন, ব্যাবসায়িক আঙ্গিক।

দীর্ঘদিন পর সিরাজভাই এর এখানে গেলাম। যে সিরাজভাই লরেন্স বাজারের পরিষদ পাকা ঘরে হাতে ঘোরানো ঢোসকা বাক্সে কালো ফোনসহ তার রাজনৈতিক, সমাজনীতি, কৃষি উত্পাদনকৌশল পরিচালনা করতেন, সেই ছোট ঘরে তার কক্ষে ৫০ বছর পর সহমুক্তিযোদ্ধা সফিক কমান্ডার সফিক ভাই, সমবায়ী মফিজ মাস্টার ভাইসহ মুক্তির আড্ডাখানা এখনো চলছে...। অনেক আশা-হতাশা ও পেছনের স্মৃতি-গল্প-কথা চাসহ বেশ জমেছিল। পরে জানা-অজানা পথে যার যার পথে চলে গেলাম। রাত তখন ১০টা। ট্রাক্টর, বীজ, সার, ইরি, জেলে নৌকা, সয়াবিন পর্দার আড়াল থেকে উত্পাদন রাজনীতির সিরাজ ভাইয়ের আজ প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তার উত্পাদন-সমবায় ও সামাজিক কর্মযজ্ঞ সমর্থন কৌশল ও সাবলীল বুদ্ধিমত্তা সবার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

n লেখক :উত্পাদন যোদ্ধা ও প্রতিষ্ঠাতা, ডর্প