পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় শক্তি হলো কাজ করার সামর্থ্য। শক্তির নিত্যতা সূত্র বলে, বিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ ধ্রুবক। শক্তি অবিনশ্বর, ইহা সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না। এক রূপ থেকে শক্তিকে কেবল অন্য রূপে রূপান্তরিত করা যায় মাত্র। যেমন—একটি বৈদ্যুতিক বাতি জ্বললে তড়িত্শক্তি আলোক শক্তিতে পরিণত হয়।
প্রাকৃতিক সব কাজকর্মের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার জন্য শক্তির ৯টি প্রকারভেদ রয়েছে। এগুলো হলো—যান্ত্রিক শক্তি, আলোক শক্তি, শব্দশক্তি, তাপশক্তি, চৌম্ব্বক শক্তি, তড়িত্ বা বিদ্যুত্শক্তি, নিউক্লীয় বা পারমাণবিক শক্তি, রাসায়নিক শক্তি ও সৌরশক্তি। আর এগুলোর মধ্যে বিদ্যুত্শক্তি থেকে অন্য শক্তিতে রূপান্তর করে কাজ করা তুলনামূলকভাবে সহজ হওয়ায় এই শক্তির প্রয়োজনীয়তা মানবজীবনে অত্যধিক। উদাহরণ দেওয়া যায়—বিদ্যুত্শক্তির মাধ্যমে লাইট, ফ্যান, চুলা, এসি, জল-স্থল-অন্তরীক্ষের যানবাহন, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, শিল্পকারখানা প্রভৃতি চালানোর জন্য এখন বিদ্যুত্শক্তির বিকল্প কল্পনা করা যায় না। সেজন্য দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, জনসংখ্যা আর নগরায়ণের কারণে আগামী বছরগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা এক্সপোনেশিয়ালভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্ব জনসংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘের সমীক্ষা বলছে, ২০১৭ সালের পৃথিবীর যে জনসংখ্যা ছিল ৭.৬ বিলিয়ন তা আগামী ৩০ বছর পর অর্থাত্ ২০৫০ সালের মধ্যেই ৯.৭ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে প্রতি চার মাসে চীনের সাংহাই শহরের মতো আয়তনের একটি শহর নগরায়ণের আশীর্বাদ গ্রহণ করছে পুরো বিশ্ব জনসংখ্যা মিলে। এর ফলে ২০৫০ সালে বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা নগরায়িত হবে, যা ২০১৮ সালের চেয়ে প্রায় ৫৫ ভাগ বেশি। পরিবেশের ক্ষতিসাধন না করে এই বৃহত্ আকারের জনজীবনে শক্তির চাহিদা মেটাতে কার্বনমুক্ত এনার্জি আবশ্যক। কেননা ২০১৮ সালে কার্বন ডাইঅক্সাইডের বৈশ্বিক ঘনত্ব বেড়েছে ১.৭ ভাগ যা ২০১০ সাল হতে গড় বৃদ্ধির চেয়ে ৭০ ভাগ বেশি। এসবের ফলে ত্বরান্বিত হচ্ছে গ্রিনহাউজ ইফেক্ট। আবার অন্যদিকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বায়ুদূষণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবেশ ঝুঁকি। বিশ্বের ৭ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ বলে সতর্ক করছে সংস্থাটি। তাই, বিশুদ্ধ বায়ু আমাদের জন্য অতি আবশ্যক বিষয়গুলোর একটি। আর বিশুদ্ধ বায়ু পেতে হলে বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণ কমানো অত্যাবশ্যকীয়।
ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশন বলছে, একাধিকবার গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে—নিউক্লিয়ার বা পারমাণবিক বিদ্যুত্ কম নিঃসরণ করে বিদ্যুত্ উত্পাদন করার অন্যতম গ্রহণযোগ্য উত্স। কম কার্বন নিঃসরণ করে বিদ্যুত্ উত্পাদন প্রক্রিয়ায় হাইড্রোপাওয়ারের পরেই অবস্থান নিউক্লিয়ারের তথা পারমাণবিক বিদ্যুতের। এনার্জি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্বের প্রায় সব কটি বড় প্রতিষ্ঠান টেকসই ভবিষ্যতের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুতের বর্ধিতকরণের পক্ষে মতামত দিয়েছে। আর তা না করলে ভবিষ্যতে বিশ্বকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। তবে, নিরাপত্তার কথাটা রাখতে হবে সর্বাগ্রে। মোট জনসংখ্যায় আমাদের পরেই রাশিয়ার অবস্থান। প্রায় ১৬৪ মিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে সংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্বে বাংলাদেশ ৮ম বৃহত্ আর প্রায় ১৪৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে রাশিয়া একই ক্যাটাগরিতে ৯ম অবস্থানে আছে। তবে, দেশটি বড় হওয়ায় এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম—প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে কেবল ১০-১২ জন আর আমাদের প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১ হাজারের বেশি। জনবসতিতে আমাদের মতো ঘনবসতি না হলেও আবাসন জায়গা বা শহরগুলোতে মানুষের আনাগোনা অন্যান্য দেশের মতোই।
বাংলাদেশ সরকার প্রণীত পাওয়ার সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান-২০১৬ অনুযায়ী, স্থাপিত বিদ্যুত্ক্ষমতা ২০২১ সালে ২৪ হাজার মেগাওয়াট, ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালে ৬০ হাজার মেগাওয়াট করার পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা দিনদিন বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছি। আমাদের সংবিধানে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লব সংক্রান্ত ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতিকরণের মাধ্যমে আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে উল্লেখ আছে। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে বর্ণিত রয়েছে। আর সে আলোকেই আমাদের বিদ্যুতের অগ্রযাত্রা চলমান। এখন প্রায় ৯৩ শতাংশ জনগোষ্ঠী বিদ্যুতের আওতায় এসেছে [অ.স.- ২০১৯]। গত ২৭ আগস্ট তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ৩১টি উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতাভুক্ত বলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। বিদ্যুতের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এরূপ দূরদর্শিতার কারণে বিদ্যুত্ খাতে এখন স্লোগান—‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুত্’।
আমাদের মোট উত্পাদিত বিদ্যুতের ৫৬ ভাগ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্স থেকে। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতও অফুরন্ত নয়। আমাদের সীমিত সম্পদকে কাজে লাগাতে বিদ্যুত্ উত্পাদন উেসর বহুমুখিতা অপরিহার্য। তাই, গ্যাসের ওপর অধিক নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যে সরকারের কয়লা, ডুয়েল ফুয়েল ও পারমাণবিক শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুত্ উত্পাদন যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। রূপপুরকে ঘিরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বপ্ন দেখেছিলেন আর পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া যে পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই স্বপ্ন আর পরিকল্পনার আলোকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একঝাঁক দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন স্তরের পাবনার ঈশ্বরদীতে দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এই বিদ্যুেকন্দ্র সফলভাবে উত্পাদনে যাওয়ার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে পারমাণবিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উত্পাদিত ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্।
গত ২০ আগস্ট রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম দেশটির পারমাণবিক শিল্পের ৭৫তম বছর উদ্যাপন করেছে। ১৯৪৫ সালের এই দিনে পারমাণবিক শক্তিতে বলীয়ান হয় দেশটি। এই দীর্ঘ সময়ে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বর্তমান রাশিয়ান ফেডারেশন পারমাণবিক প্রযুক্তিতে যে বেশ এগিয়েছে তা আর বলার উপেক্ষা রাখে না। আর আমাদের রূপপুর প্রকল্পে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছে রোসাটম। তাদের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে সফলভাবে অপারেশনের মাধ্যমে রূপপুর তথা বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুত্ খাতে অদূর ভবিষ্যতে উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছে একটি মডেল হয়ে দাঁড়াবে তা বলা যায়।
বৈশ্বিক অন্যান্য ফুয়েলের মতোই আমাদের সিংহভাগ বিদ্যুত্ উত্পাদনের উত্স প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমছে প্রতিনিয়ত। ভৌগোলিক কারণে এই বদ্বীপে হাইড্রো কিংবা উইন্ড থেকেও খুউব বেশি বিদ্যুত্ উত্পাদন করা সম্ভব হবে না। সোলারের ক্ষেত্রে আছে বিশাল খোলা জায়গা আর স্টোরেজের সীমাবদ্ধতা, তাই নিউক্লিয়ার প্রযুক্তিই হতে পারে আমাদের বিদ্যুতের জন্য ত্রাতা। এর সেই প্রযুক্তিকে গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা ও পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত করে তাদেরকে এই সেক্টরে ধরে রাখাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কেননা তেল-গ্যাসের মজুত, বৈশ্বিক উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর উচ্চ এনার্জি ডিমান্ড প্রভৃতি বিষয় আমলে নিলে দেখা যায়, আগামী বিশ্বে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতপূর্বক নিউক্লিয়ার বা পারমাণবিক বিদ্যুত্ উত্পাদনই হবে অর্থনীতির চাকা ঘোরাবার সবচেয়ে বড় নিয়ামক।
n লেখক :প্রকৌশলী, রূপপুর পারমাণবিক
বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প