‘সবাই মিলে খেলে আত্মীয়তা বাড়ে’

বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে দুর্নীতি শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে—নীতিবিরুদ্ধ; কুনীতি; অসদাচরণ। যারা নীতিবিরুদ্ধ আচরণ করে তারা দুর্নীতিপরায়ণ বা দুরাত্মা। নীতিভ্রষ্ট মানুষ দুর্নীতিবাজ হয়। এরা সমাজবিরোধী, মানবতার শক্র। অন্যদিকে মানবীয় শব্দের অর্থ হলো মনুষ্যোচিত; মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক। মানবতা মানে মানুষের গুণ; মনুষ্য ধর্ম; মনুষ্যত্ব; মানবের ভাব; humanity। স্বামী বিবেকানন্দের মতে, ‘তাঁদেরই মহাত্মা বলি, যাঁদের হূদয় থেকে গরিবদের জন্য রক্তমোক্ষণ হয়, তা না হলে সে দুরাত্মা।’ ‘নীতি’ শব্দের আগে ‘দুঃ’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে দুর্নীতি শব্দটি গঠিত হয়েছে। এর অর্থ নীতির খেলাফ। যা অন্যায়, অনিয়ম তাই দুর্নীতি। যা করা উচিত, যা করা দরকার, যা ন্যায়সঙ্গত এর বিপরীতই দুর্নীতি।

মানুষের পরিচয় তার মনুষ্যত্বে। বিবেক ও বুদ্ধি আছে বলেই মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে শ্রেষ্ঠ। বিধাতা মানুষকে দোষ-গুণে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের মধ্যে পাশাপাশি অবস্থান করছে প্রেম-ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা এবং হিংসা-বিদ্বেষ। সুনীতি ও দুর্নীতি দুটোই মানুষের মধ্যে রয়েছে। দুর্নীতি যখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখনি মানুষ পরিণত হয় অমানুষে।

সমাজবিজ্ঞানীদের অভিমত, সমগ্র পৃথিবীতে চারটি ব্যাধি প্রকট হয়ে উঠেছে—প্রথম ব্যাধি :মানুষ মানুষকে অবিশ্বাস করে। দ্বিতীয় ব্যাধি :সুস্থ জীবন দর্শনের অভাব। তৃতীয় ব্যাধি: অন্তর জীবনে অসংখ্য বাধা। চতুর্থ ব্যাধি : স্বাধীন চিন্তার অভাব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘তুমি তো ভালোই হাঁটছ। কিন্তু যাদের পায়ে দলে তুমি হাঁটছ তারা যখন তোমার পা জড়িয়ে ধরবে তুমি তখন আর চলতে পারবে না। তুমি একা খেলে চলবে না। একা খেলে ক্ষুধা মিটে। সবাই মিলে খেলে আত্মীয়তা বাড়ে।’ সেই আত্মীয়তার বিষয়টিই সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদের ওপর ভর করেই আগামী দিনের বাংলাদেশ বেড়ে উঠবে, সেই প্রত্যাশা নিয়েই বেঁচে আছি।

আমাদের মনে রাখতে হবে অনুদার গণতন্ত্র আমরা চাই না। গণতন্ত্রে অন্যায় চাপ প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। গণতন্ত্রে দ্বিমত থাকবেই। যেখানেই উদার গণতন্ত্র সচল থাকে, সেখানেই সুন্দর দেশ গড়ে ওঠে। আর প্রকৃত উদার গণতন্ত্র কায়েম হলেই টেকসই মানবিক উন্নয়নের ধারা সূচিত হবে। এই ধারার শক্ত ভিত্তি তৈরির প্রক্রিয়ায় তরুণ সমাজের অবদান হতে হবে মুখ্য।

কালো টাকা আর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে রাষ্ট্র আজ হুমকির মুখে। ‘রাষ্ট্র ব্যক্তিকে গিলে খাচ্ছে’ হবস অবশ্য সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগেই রাষ্ট্রের ঐ প্রবণতা আঁচ করেছিলেন এবং একে তুলনা করেছিলেন এক বিশাল তিমি লেভিয়াথানের (Leviathan) সঙ্গে, যার পেটের মধ্যে আমরা। দুর্নীতি হয় যখন স্বচ্ছতা থাকে না, জবাবদিহিতা থাকে না। বাংলাদেশের উন্নতির পথে দুর্নীতি এখন প্রধান অন্তরায়। এমন কোনো সরকারি অফিস নেই, যেখানে অবৈধ অর্থের লেনদেন হয় না, টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না—এ যেমন এক অমোঘ সত্য। সামান্য বেতনে চাকরি করে রাতারাতি বিরাট বিল্ডিং আর ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক হয়ে গেছেন—এমন সরকারি কর্মকর্তার নজির হাজারো।

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানব জাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সত্কাজের আদেশ করবে এবং অসত্ কাজ থেকে মানুষদের বিরত রাখবে।’ কোরআনের এ মর্মবাণী অনুধাবন করে দুর্নীতিমুক্ত, সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিকামী সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে তত্পর হই।

দিনাজপুর