পবিত্র আশুরা :সত্য ও ন্যায়ের জয় হউক

আজ ১০ মহরম। পবিত্র আশুরা। আশুরা অর্থ দশম। ইসলামের দৃষ্টিতে হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহরমের দশম তারিখকে বলা হয় আশুরা। বিশ্বজগতের প্রারম্ভকাল হইতেই দিবসটি বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত। আরব দেশে জিলকদ, জিলহজ, মহরম ও সফর—এই চার মাসকে একত্রে বলা হয় আশহারুল হুরুম বা সম্মানিত মাসসমূহ। একদিকে মহরম পবিত্র মাস, আবার এই মাসের ১০ তারিখ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনায় চিরভাস্বর বিধায় ইহা এই মাসকে করিয়াছে আরো মহিমান্বিত। এই পবিত্র দিনে আল্লাহ তায়ালার হুকুমে দুনিয়া সৃষ্টি হইয়াছে। আবার কিয়ামতও সংঘটিত হইবে এই দিনে। এই দিনে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন প্রায় ২ হাজার পয়গম্বর। আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর দেহে পাক রুহ প্রদান, মা হাওয়া (আ.)কে পয়দা, মহাপ্লাবন শেষে হজরত নুহ  (আ.)-এর জুদি পাহাড়ে অবতরণ, নমরুদের অগ্নিকাণ্ড হইতে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নাজাত, ৪০ দিন মাছের পেটে থাকিবার পর হজরত ইউনুস (আ.)-এর নিষ্কৃতি, হজরত আইউব (আ.)-এর ১৮ বত্সর পর রোগমুক্তি, হজরত মুসা (আ.)-এর নীল নদ পাড়িদান এবং ফেরাউনের সলিলসমাধি, হজরত ঈসা (আ.)-এর ঊর্ধ্বাকাশে গমনসহ অসংখ্য আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী এই দিবসটি।

উপর্যুক্ত কারণে পবিত্র আশুরা হইতেছে একটি শুকরিয়া দিবস; কিন্তু ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৬১ হিজরির ১০ মহরমের এই দিনেই ঘটিয়াছে বিশ্ব মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচাইতে মর্মান্তিক ও বিয়োগান্তক ঘটনা। এই দিনে বর্তমান ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালার মরুপ্রান্তরে আখেরি নবি হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর প্রিয় দৌহিত্র, ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) ও খাতুনে জান্নাত ফাতেমাতুজ জোহরা (রা.)-এর আদরের পুত্র ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদতবরণ করেন। এই হিসাবে আশুরা শোকাবহ একটি দিনের চিরন্তন প্রতীকও বটে। ঐ দিন ইমাম হুসাইন (রা.)সহ তাহার ৭২ সঙ্গীসাথি এক অসম যুদ্ধে শাহাদতের পেয়ালা পান করেন, যাহাদের অধিকাংশই ছিলেন আহলে বায়াত বা নবি (স.)-এর বংশধর। কারবালার এই মর্মন্তুদ ঘটনা কুটিলতা ও নৃশংসতার এক চরম দৃষ্টান্ত এবং ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। এই দিনে আহলে বায়াতদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শনপূর্বক তাহাদের সংগ্রামী জীবন হইতে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।

আশুরার দিনের কর্তব্য হইল রোজা রাখা, দানখয়রাত করা এবং বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন থাকা। হাদিস শরিফে রমজানের পর মহরমের এই রোজা পালনকে সর্বোত্তম বলা হইয়াছে। ইহার মাধ্যমে বিগত এক বত্সরের গুনাহ মাফ হইয়া যায়। অন্যদিকে এক আল্লাহ ছাড়া কাহারও নিকট মাথা নত না করিবার শিক্ষা দেয় ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘ফিরে এলো আজ সেই মহররম মাহিনা/ ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না’। ইসলামি শরিয়তের রীতিও হইল কাহারও মৃত্যুর পর তিন দিনের অধিক শোক পালন না করা। তাই কারবালার ভয়াবহ শোককে আমাদের শক্তিতে পরিণত করিতে হইবে। অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান ও ত্যাগের যে শিক্ষা কারবালার ঘটনা মানব জাতিকে দিয়াছে, তাহা আজকের দুনিয়ায় অন্যায় ও অবিচার দূর করিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করিতে পারে। অতএব, কারবালার ত্যাগের মহিমায় সবার অন্তর আলোকিত ও শুদ্ধ হউক। জয় হউক সত্য ও ন্যায়ের।