বাইসাইকেল চড়ে জনসভায় আসা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি আজও ভোলেনি চৌগাছা-ঝিকরগাছাবাসী

বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলার স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, পাকিস্তানি হায়েনাদের শাসন, বঞ্চনার হাত থেকে বাঙ্গালিদের উদ্ধার। অথচ সেই বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ধরে রাখতে কেন এত কার্পণ্যতা? সাধারণ জনগণের মধ্যে তা আজ প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে ‍যশোরের চৌগাছার মুক্তারপুর গ্রামে অবস্থিত অরক্ষিত বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি স্তম্ভটি নিয়ে। 

আজ থেকে ৬৬ বছর আগে। সময়টা ছিলো ১৯৫৪ সাল। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় শেখ মুজিবুর রহমান (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) বাইসাকেল চালিয়ে মতান্তরে গরুর গাড়িতে চৌগাছার মুক্তারপুর গ্রামে জনসভা করতে এসেছিলেন। 

মুক্তারপুর গ্রামে প্রিয় মুজিব ভাই আসছেন, এলাকায় প্রচার হওয়ার পর মানুষের উপচে পড়া ভিড়। হেঁটে,বাইসাইকেলে, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি করে স্রোতের মত মানুষের আসছেন জনসভাস্থলে। তার ভাষণ শুনতে মানুষ তখন উতলা, উদ্বেল, উৎকণ্ঠাভরা মন নিয়ে চাতক পাখির মত পথ চেয়ে। 

১৯৫৪ এর ১০ মার্চ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের আগে গোটা দেশব্যাপী সাংগঠনিক ও নির্বাচনী প্রচার অভিযান চলছে। ৭টি দলের সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট। খুলনা হয়ে যশোরে আসলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উঠলেন যশোর আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট মশিউর রহমানের বাসায়। এর আগেও বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ, পাকিস্তান মুসলিম লীগ বিরোধী আন্দোলনের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা অকৃতিম অগ্রজ মসিউর রহমানের বাসায় এসেছেন। বঙ্গবন্ধু মশিউর রহমানকে বড় ভাই হিসেবে জানতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন। 

যশোর ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট সংলগন্ন এ বাসায় স্বদেশী আন্দোলনে, বাংলা ভাষা, বাঙ্গালি জাতয়ীতাবাদের পক্ষে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আগমন করেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মত নেতারা।

মসিউর রহমানের বাসায় দীর্ঘ সাংগঠনিক ও নির্বাচনী আলাপ শেষে সিদ্ধান্ত হলো মশিউর রহমানের নির্বাচনী এলাকায় দুটি জনসভা হবে। একটি উত্তরে চৌগাছার সিংঝুলি ইউনিয়নের মুক্তারপুর গ্রামে অপরটি দক্ষিণে ঝিকরগাছার নায়ড়ায়। সে মোতাবেক প্রস্তুতি। খবর দিলেন ঝিকরগাছা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুর বকসী হাজিকে (নুর বকসী হাজির বাড়ি ছিল চৌগাছার উজিরপুর গ্রামে)। জনসভার স্থান নির্ধারণ করলেন চৌগাছার মুক্তারপুর প্রাইমারি স্কুলের মাঠে। নুর বকসী হাজি খবর দিলেন অনুজ আওয়ামী লীগের তৎকালীন চৌগাছার সিংহঝুলি ইউনিয়নের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও অবিভক্ত চৌগাছা-ঝিকরগাছা থানার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তারপুর গ্রামের সামসুজ্জোহা ভাটাই বিশ্বাসকে। সদা হৃদ্যতায়ভরা, এলাকায় জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ভাটাই বিশ্বাস খবর পেয়ে আপ্যায়ন এবং তাদের বিশ্রামের জন্য প্রস্তুতি নিলেন। নিজ পুকুরের ১২ সের ওজনের রুই, কাতলা ধরলেন এবং ২৭ সের ওজনের একটি খাশি জবাই করলেন। 

আরও পড়ুন: নড়াইলের জামাই বাবু প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে নড়াইলে শোক, বিভিন্ন কর্মসূচি

তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মশিউর রহমানের সাথে করে যশোর থেকে লক্কর-ঝক্কর বাসে চেপে সোজা ১৪ মাইল পশ্চিমে শহীদ মশিউর রহমানের গ্রামের বাড়ি সিংহঝুলী আসলেন বঙ্গবন্ধু। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ঝিকরগাছার অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান। বঙ্গবন্ধু এবং মশিউর রহমান দুইটা বাইসাইকেল যোগে উপস্থিত হলেন মুক্তারপুর ভাটাই বিশ্বাসের বাড়িতে। সফর সঙ্গী ছিলেন অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন, অ্যাডভোকেট রওশন আলী, তৎকালীন সাবাশ চেয়ারম্যান নামে খ্যাত আবুল ইসলাম এবং নূর বকসী হাজি। 

শেখ মুজিব ভাই (তখনকার সময় শেখ মুজিব সাহেব না হয় মুজিব ভাই বলে ডাকত) আসছেন, এলাকায় যেন হিল্লোল বইছে। শত শত বাইসাইকেল, অগণিত গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি এবং কপোতাক্ষে নৌকা যোগে মুক্তারপুর স্কুল মাঠে জমায়েত হন কৃষক ছাত্র জনতা। জনতার ঢল উপচে পড়া ভিড়ে নিঝুম নিভৃত মুক্তারপুর মুহূর্তে প্রণচঞ্চলতায় ভরে উঠল। 

খাওয়া শেষে স্কুল মাঠের বক্তৃতা মঞ্চে চলে গেলেন উভয় নেতা। স্কুল মাঠ কপোতাক্ষ নদের পাড়। জনসভার সংবাদে চৌগাছা, ঝিকরগাছা এবং শার্শা এলাকায় বাঁধভাঙ্গা জোয়ার চলছে। যুক্তফ্রন্টের ঐ জনসভায় সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন ঝিকরগাছা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জোহা ভাটাই বিশ্বাস। প্রধান অতিথির বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু তার স্বাভাব সুলভভঙ্গীতে বাংলার জনগণের হৃদয়ের পুঞ্জীভূত বেদনা, শিক্ষা, অর্থনীতি, কৃষি সংস্কৃতি, পাকিস্তানি হায়েনাদের শোষণ-বঞ্চনার গভীর দর্শন উপস্থাপন করেন ২১ দফার আলোকে। তখন জনতার মুহু মুহু করতালিতে জনসভা মুখরিত হয়ে উঠে। জাতির মুক্তি আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের আগমন পূর্ণিমার চাঁদ যেন জনতার হাতের মুঠোয় তখন ঝলসাচ্ছে। 

সভা শেষে বঙ্গবন্ধু ভাটাই বিশ্বাসের বাড়ি রাত্রি যাপন করে পরের দিন ঝিকরগাছার নায়ড়া গ্রামে জনসভা করার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানেও তিনি বাইসাইকেলে চেপে দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে জনসভা করেছিলেন। নায়ড়া গ্রামের জনসভা পরিচালনা করেন সাবাশ চেয়ারম্যান আবুল ইসলাম। নায়ড়া গ্রামের জনসভা শেষে বঙ্গবন্ধু ঝিকরগাছার মটর ব্রিজ সংলগ্ন দীনবন্ধু দফাদারের বাসার দোতলায় রাত যাপন করেন। দিনবন্ধুর ওই দোতলা তখন যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হতো। রাতে দোতলার বিশাল খোলা ছাদে কর্মীদের নিয়ে সভা করেন। সে সভায় মসিউর রহমানের নির্বাচন পরিচালানার আহ্বায়ক করা হয় নুর বকসি হাজিকে। নুর বকসি হাজি পরবর্তী যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিরও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের সময় মুক্তারপুর গ্রামের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ আজও ভোলেনি চৌগাছা-ঝিকরগাছাবাসী।

এ সম্পর্কে ১৯৯৯ সালে দৈনিক ইত্তেফাক প্রত্রিকায় একটি অনুসন্ধানমূলক সংবাদ ছাপা হয়। তারই ফলশ্রুতিতে তৎকালীন চৌগাছা-ঝিকরগাছার এমপি অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম জাতির জনকের স্মৃতি ধরে রাখতে ওই জনসভা স্থলে মাইকেল মধুসূধন দত্তের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদের পাশে একটি স্মৃতি স্তম্ভ স্থাপন করেন। স্মৃতি স্তম্ভটি অরক্ষিত এবং দেখভাল করার কেই না থাকায় ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় আরও একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত কারো নজরে আসেনি। স্মৃতি স্তম্ভটি আজ অযত্ন, অবহেলা এবং অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। এখানে এখন কুকুর, বেড়ালের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া ওই গ্রামের মানুষ এখানে পাট খড়ি শুকানো থেকে শুরু করে গরু বেঁধে অপরিচ্ছন্ন করে রেখেছে। অতিদ্রুত রক্ষাণাবেক্ষণ না করলে বর্তমান স্মৃতিস্তম্ভটি যেকোন সময় পানির স্রোতের আবার কপোতাক্ষ নদে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

সরেজমিন পরিদর্শনে ওই জনসভার প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তারপুর গ্রামের আবু তালেব (৯০) জানান, আমি তখন হাফ পেন্ট পরে দেখতে গিয়ে ছিলাম। মুজিব ভায়ের জ্বালাময়ী ভাষণ আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে। 

ওই গ্রামের দাউদ হোসেন (৯০) জানান, স্মৃতি স্তম্ভটি আমারই হাতে গড়া বলে দাবি করে বলেন-আমরা বুড়ো হয়ে গেছি, আমাদের আর কোন দাম নেই। কে শোনে কার কথা। তরুণ সমাজের বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানার জন্য স্মৃতিস্তম্ভটি রক্ষণাবেক্ষণ খুবই দরকার। এছাড়া বঙ্গবন্ধু যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে মুক্তারপুর সভা স্থলে গিয়েছিলেন, সে হেরিংবোন রাস্তটিও চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। স্মৃতিস্তম্ভটি কেন অরক্ষিত সে বিষয়ে চৌগাছার রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধারা কেউই সদুত্তর দিতে পারেনি। তবে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে স্মৃতি স্তম্ভটি সংস্কারের জন্য বর্তমান এমপি অর্ধলক্ষ টাকা বরাদ্দ করলেও সেটাও পেটুকদের পেটে চলে গেছে জানা গেছে। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধা ঐক্য পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম জানান, আমরা অতিসত্বর স্থানটি পরিদর্শনে যাব।

ভাটাই বিশ্বাসের ছোট ছেলে বর্তামান প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের (এনজিও বিষায়ক ব্যুরো) সচিব রাশেদুল ইসলাম জানান, বঙ্গবন্ধুর স্মুতি রক্ষার্থে স্মৃতিস্তম্ভটি খুব তাড়াতাড়ি সংস্কারসহ সংরক্ষণ করা হবে। 

এ ব্যাপারে জানার জন্য চৌগাছা-ঝিকরগাছা আসনের বর্তমান এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) ডা. নাসির উদ্দীনেকে ফোন করলে তিনি ফোন ধরেননি। 

ইত্তেফাক/এএএম