পুনঃপাঠ

লেখা

 

লেখা জিনিসটে আমার অতিশয় প্রিয়। যদি তা না হতো, তাহলে আমি একজন লেখক হয়ে উঠতুম না। কারণ লেখবার প্রবৃত্তি না থাকলে, লেখক হওয়া যায় না। আর অপর দেশে যাই হোক, বাংলাতে আজো শুধু ঐ প্রবৃত্তি চরিতার্থ করবার জন্যই লোকে লেখে। এই কারণে নতুন লেখকের আবির্ভাবই আমার মনে উত্সাহের সঞ্চার করে।

বাংলা ভাষা আমরা সকলেই ভালবাসি, এবং সেই কারণে সকলেই চাই যে, তার শ্রীবৃদ্ধি হোক। এ উন্নতিসাধন করা পাঠকের সাধ্য নয়; সাধ্য একমাত্র লেখকের। পাঠকের দলের কাছে ভাষা যে, তার শ্রীবৃদ্ধির জন্য দায়ী নয়; তার স্পষ্ট প্রমাণ এই যে, আমরা ইংরেজি বই দেদার পড়ি, কেননা তা পড়তে বাধ্য হই; অথচ এ দাবি আমরা কেউ করতে পারিনে যে, আমরা ইংরেজি ভাষার উন্নতিসাধন করছি।

আমরা যাকে উন্নতি বলি, তাও আসলে সৃষ্টির একটা অঙ্গ। যাকে আমরা সৃষ্টি বলি তার কর্তা যে, হয় প্রকৃতি নয় পুরুষ, আর তার উন্নতির কর্তা মানুষ—এরকম কথা এ যুগে কোনো দার্শনিকই বলেন না। সৃষ্টির ধারা খণ্ড খণ্ড নয়,—অনন্ত এবং এক। সুতরাং ভাষার উন্নতিসাধনের অর্থ হচ্ছে, তাকে নব কলেবর দান করে তার প্রাণ রক্ষা করা। কথাটা দার্শনিক হলেও সত্য।

এখন ভাষার নব কলেবর দান করতে পারেন কে?—অবশ্য পাঠক নন—লেখক। কারণ পাঠক হচ্ছেন সাহিত্যের ভোক্তা মাত্র, তার কর্তা হচ্ছেন লেখক। ইকনমিক্সের ভাষায় বলতে হলে লেখককে producer বলতে হয়, আর পাঠককে consumer। আর লেখক যা produce করবে, পাঠক তাই consume করতে বাধ্য—কারণ কোনোকিছু produce করা তার ধর্ম নয়। ভাষাকে নব কলেবর দিতে পারে শুধু নতুন লেখক। লেখক হিসেবে নতুন হলেই তার লেখা নতুন হয় না। নতুনের প্রধান পরিপন্থি অতীত নয়, বর্তমান। কারণ যে অতীত বর্তমানে রূপান্তরিত হয়নি, তার কোনো শক্তি নেই—কেননা তা মরা অতীত। এ কথা বলার উদ্দেশ্য নতুন লেখকদের এই কথাটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, বর্তমান পুরোনো লেখকদের মায়া কাটাতে না পারলে তাঁরা নতুন লেখক হতে পারবেন না। ধরুন আমাকে যদি পাঁচ জনে লেখক বলে মান্য করে, তাতে অবশ্য আমি নিজেকে সম্মানিত বোধ করি। কিন্তু আমি এ মনোভাবের সাক্ষাত্ পেতে চাই পাঠকের মনে—লেখকের মনে নয়। যে লেখক মনে মনে আমাদের লেখক হিসেবে বাতিল করে দিতে না পারেন, তাঁর লেখায় তাঁর স্বধর্ম ফুটে উঠবে না; আর তার ভিতর ভাবের ও ভাষার নূতন চেহারা দেখতে পাব না। নূতন লেখকের জপমন্ত্র হওয়া উচিত সোহং। যে লেখকের মনে এ ধারণা নেই, তিনি সাহিত্যের আসরে হবেন শুধু দোহার, মূল-গায়েন নয়। আর যাঁর মনে এ ধারণা আছে, তিনি হবেন হয় নূতন লেখক, নয় অ-লেখক। অ-লেখক হবার ভয় যাঁর আছে, তাঁর কলম ধরা উচিত নয়।

আমার কথা যে ঠিক, তার প্রমাণস্বরূপ সমাজের আর এক ক্ষেত্র থেকে একটি উদাহরণ দিচ্ছি। সাহিত্য বস্তু যে কী, তা সকলে জানুন আর নাই জানুন, পলিটিক্স যে কী, তা আবালবৃদ্ধবণিতা জানে। আর এক্ষেত্রে নব পলিটিশিয়ানরা যদি সুরেন্দ্রনাথকে বাতিল করে দিতে না পারতেন, তাহলে তাঁরা এ যুগের সব বড় বড় পলিটিশিয়ান হতে পারবেন না। আর পুরোনো পলিটিশিয়ানদের সঙ্গে নতুন পলিটিশিয়ানদের প্রভেদ কোথায়?—একমাত্র কথা কইবার ভঙ্গিতে। অর্থাত্ নব পলিটিশিয়ানরা, পলিটিক্সের একটা নবরীতি বা style-এর সৃষ্টি করেছে। এর থেকে অনুমান করা যায় যে, নূতন লেখকরা পুরোনো লেখকদের বাতিল না করে দিলে সাহিত্যের নবরীতি সৃষ্টি করতে পারবে না। আর নবরীতি গড়তে পারলে পাঠকেরও অভাব হবে না। তেড়েফুঁড়ে লিখতে পারলে পাঠকসমাজ বলবে ‘জীতা রহো, তোমভি মিলিটারি’। আমার কথা আমি স্পষ্ট করে বলতে পেরেছি কী না জানিনে। কিন্তু আসল বক্তব্য এই যে, নূতন লেখকদের কাছ থেকে এই আশা করি যে, তাঁরা বাংলা সাহিত্যের একটি নব পর্যায়ের সৃষ্টি করবেন। কারণ তাঁরা যদি তা না করেন, তাহলে বঙ্গসরস্বতী যেখানে আছে সেইখানেই থেকে যাবেন, এক পা-ও অগ্রসর হতে পারবেন না।

নতূন লেখকেরা পুরোনো লেখকদের মুখাপেক্ষী না হলেই যথার্থ নূতন লেখক হয়ে উঠবেন।

                                                                                                             [জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৩৪] 

সূত্র : আরো লেখা/প্রমথ চৌধুরী (বাংলা একাডেমি, ২০১৮)