ড. মিল্টন বিশ্বাস
পরলোকগত হলেন বাংলাদেশের পরম বন্ধু, হিতাকাঙ্ক্ষী, মুক্তিযুদ্ধের অকুণ্ঠ সমর্থক ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি (জন্ম ১১ ডিসেম্বর ১৯৩৫, মৃত্যু ৩১ আগস্ট ২০২০)। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশে ২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। এই মহান ব্যক্তির মহাপ্রয়াণে শোকে মুহ্যমান হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অভিভাবক ও পারিবারিক এই বন্ধু সম্পর্কে শোকবার্তায় তিনি বলেছেন, ‘প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে ভারত হারাল একজন বিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক নেতাকে, আর বাংলাদেশ হারাল একজন আপনজনকে। তিনি উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন।’ বাংলাদেশের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল অপরিসীম। বিবাহসূত্রে কেবল বাংলাদেশের জামাই বলেই নন, তিনি রাজনীতিবিদ হিসেবে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। লেখা বাহুল্য, এদেশের মাটির সঙ্গে প্রণব মুখার্জীর সংযোগ বহু দিনের। বাঙালি হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল প্রাণের টানে উজ্জীবিত। তিনি লিখেছেন—‘ভারত ও বাংলাদেশ শুধু প্রতিবেশী নয়; তাদের মধ্যে রয়েছে নৃতাত্ত্বিক ও জাতিগত বন্ধন। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টি ভারত সব সময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। কেননা, আমরা অভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা ও ভৌগোলিক সংহতি ধারণ করি।’ তার রাজনৈতিক কর্মজীবন ছিল ছয় দশকব্যাপী বিস্তৃত। তিনি ছিলেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা। আর প্রণব মুখার্জির দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় থেকেছে তখনই বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার কীর্ণাহারের মানুষ প্রণব মুখোপাধ্যায় আপনজনের কাছে পল্টু হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালে তিনি যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তখন এদেশের জনগণ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে উত্তাল সময় পার করছে। স্বাধীনতা অর্জনের সেই পথে আমাদের নেতাদের ভারতের যে সমস্ত উজ্জ্বল নক্ষত্রের দেশপ্রেম দ্বারা উজ্জীবিত হওয়ার দৃষ্টান্ত ছিল তাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি কাজ করেছেন শিক্ষক এবং সাংবাদিক হিসেবে। এক সময়ের দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক এই নেতা রাজনীতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বদান্যতা পেয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য, ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর একজন বিশ্বস্ত সহকর্মী। ১৯৭৩ সালে ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভায় স্থান পান তিনি। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার দলনেতাও ছিলেন। জীবনে প্রথমবারের মতো ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী, আবার ১৯৯৫-৯৬ সালে রাওয়ের মন্ত্রিসভায় বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ২০০৬ সালে তিনি পুনরায় ভারতের বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্বে নিযুক্ত হন। ২০০৯ সালে মনমোহন সিংয়ের দ্বিতীয় মেয়াদে অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব পান, ছিলেন ২০১২ পর্যন্ত। প্রণব মুখার্জি রাজনৈতিকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী ছিলেন। একজন বাস্তববাদী হওয়ায় নিজের সরকারের দুর্নীতি সম্পর্কেও সর্বদা সতর্ক থাকতেন। ১৯৮৪ সালে ইউরোমানি পত্রিকার একটি সমীক্ষায় তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পাঁচ অর্থমন্ত্রীর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হন। ‘ইমার্জিং মার্কেটস’ জার্নাল তাকে ২০১০ সালে এশিয়ার সেরা অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছিল। ১৯৯৭ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ সংসদ সদস্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।
১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর শেখ হাসিনা যখন ভারতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন তখন প্রণব মুখার্জির পরিবারের অকুণ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছিলেন। তৈরি হওয়া সেই পারিবারিক সম্পর্ক পঁচাত্তরের পর দিল্লি হয়ে এদেশে প্রসারিত হয়েছিল আন্তরিকতার ছোঁয়ায়। জননেত্রী সম্পর্কে প্রণব মুখার্জি লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনা আমাদের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু। আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির মাধ্যমে ভারত তার দাবি পূরণে সহায়তা করার চেষ্টা করেছে। শেখ হাসিনা কারাগারে থাকার সময় আওয়ামী লীগের কিছু নেতা তাকে পরিত্যাগ করলে আমি তাদের ভর্ত্সনা করে বলি, কেউ যখন এমন বিপদে থাকে, তখন তাকে ত্যাগ করা অনৈতিক।’
২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রণব মুখার্জির আত্মজীবনী ‘বাই দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস ১৯৯৬-২০১২’ গ্রন্থে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা আছে। সেখানে শেখ হাসিনার কথাও বিবৃত হয়েছে। বিশেষত ২০০৭ সালের জুলাই মাসে নেত্রী যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবজেলে বন্দি তখন তিনি তাকে মুক্ত করতে ভূমিকা নিয়েছিলেন। সে সময় তাকে মুক্ত করার জন্য তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকেও হস্তক্ষেপ করতে অনুরোধ করেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তার পরামর্শ ও সহযোগিতা পেয়েছিলেন। ২০০৮ সালে শান্তিপূর্ণ উপায়ে, বিশ্বাসযোগ্য, মুক্ত ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনে তার অবদান এ জাতি সব সময় স্মরণ করবে। এদেশের স্থিতিশীল পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার জন্য অন্তরালে থেকে তিনি সাহসের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। অর্থাত্ শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় এসেছেন তখনই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতা পেয়েছেন। বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার অবদান চিরভাস্বর।
প্রণব মুখার্জির অবদান বাংলাদেশ কৃতজ্ঞচিত্তে সব সময় স্মরণ করে বলেই ২০১৩ সালের ৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সাম্মানিক ডক্টরেট অব ল ডিগ্রি দেয়। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সর্বান্তকরণে সমর্থন দান করেছিলেন তিনি। এজন্য ২০১৩ সালের ৫ মার্চ তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ পান। মহাপ্রয়াণ হলেও ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি সত্যিকারের রাজনীতিবিদ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বাঙালি এই রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন। এ দেশের জনগণ তার অবদানকে চিরকাল মনে রাখবে।
n লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়