ট্রাম্প কি ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে?

আসন্ন মার্কিন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। ২০২০ সালের এই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব। নির্বাচনের ফলাফলের ওপর পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থার অনেক কিছুই নির্ভর করছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুইটি রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান পার্টি। আধুনিক উদারনীতিতে বিশ্বাসী ডেমোক্র্যাটদের মূলনীতি সাশ্রয়ী মূল্যের শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। তাদের মূলনীতির দিকে লক্ষ্য রেখেই এগিয়ে যাচ্ছে দলটি। এদিকে কট্টরপন্থি রিপাবলিকান পার্টি মার্কিন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে তাদের আস্থার জায়গা হারিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেশে এবং বিদেশে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড জনমনে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। যত দিন গড়াচ্ছে মার্কিন নির্বাচনের সময় তত ঘনিয়ে আসছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পর্কিত বিভিন্ন জরিপে বারবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষেত্রে নেতিবাচক ফলাফল দেখা গিয়েছে । জুলাইতে এক জরিপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রতিদ্বন্দ্ব্বী জো বাইডেনের থেকে ১৫ পয়েন্ট কম পেলে রাগান্বিত হয়ে তার নির্বাচনি প্রচার কার্যের ম্যানেজারকে বাদ দিয়ে দেন। এর আগেও অনেক সমীক্ষায় দেখা গেছে ট্রাম্পের তুলনায় বাইডেনের জনসমর্থন অনেকটাই বেশি। মার্কিন জনগণের মন থেকে ট্রাম্পের এরকম বেরিয়ে যাওয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অতীতের যত রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন তারা নিজ দেশ বিবেচনায় ভারসাম্য পূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতেন। তখন রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন হলেও পূর্বের জনের গৃহীত সিদ্ধান্ত বা ঘোষণাকৃত কোনো চুক্তি বা প্রোজেক্ট পরবর্তী প্রেসিডেন্ট এসে পূর্ণ করার প্রতিশ্রুতি দিতেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতীতকালের পররাষ্ট্রনীতির ধারা ভেঙে নিজস্ব ভণিতায় সব কার্যক্রম করেছেন। তার প্রায় সব সিদ্ধান্ত অস্পষ্ট যা বিব্রতকর। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশায় প্রায় সব আমেরিকান রাষ্ট্রপতি ফিলিস্তিন এবং ইসরাইলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু অতীতের সব নিয়মনীতি না অনুসরণ করে অথবা ভারসাম্য পূর্ণ কোনো নতুন নীতি প্রণয়ন না করে একতরফাভাবে ইসরাইলের পক্ষ নিয়েছে।

ফলাফল হিসেবে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আন্দোলন এবং তীব্র প্রতিক্রিয়াকে ট্রাম্প কোনো পাত্তাই দেয়নি। ট্রাম্প নির্বাচনে জয়লাভ করার পর ওবামা কেয়ার বাতিলসহ সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারিতা এবং খাম-খেয়ালি সিদ্ধান্তের কারণে মার্কিন প্রশাসনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ক্ষমতায় বসার পর একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সাম্প্র্রতিক সময়ে করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে ভারসাম্যহীন বক্তব্য প্রদান করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি এটাকে চীনা ভাইরাস বলে আখ্যা দেন। আমরা জানি যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথম থেকেই এই ভাইরাসকে অবজ্ঞা করে আসার কারণেই নাকি যুক্তরাষ্ট্রে এরকম বিস্ফোরণ হয়েছে বলে দাবি করেন বিশেষজ্ঞরা। ভাইরাস প্রতিরোধ এবং আক্রান্ত রোগীদের কীভাবে দ্রুত সেবাদান নিশ্চিত করা যায় সেটা না ভেবে, ট্রাম্প চীনকে দোষারোপ করার কাজেই ব্যস্ত ছিলেন। করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অসংখ্য ব্যক্তি চাকরি হারিয়েছে।

হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে সঠিক চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে না এরকম দাবিও অনেকে তুলেছেন। আবার জর্জ ফ্লোয়েডের হত্যাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফুসে উঠে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। সারা দেশে বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভ এবং র?্যালি বের করে সাধারণ জনগণ। জর্জ ফ্লোয়েডকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বেও বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। নিজ দেশে বিক্ষোভকারীদের কৌশলে বুঝানোর চেষ্টা না করে তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আরো বিতর্কের মুখোমুখি হন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সর্বোপরি বিদেশনীতি, করোনা ভাইরাস মোকাবিলা ব্যর্থতা, মধ্যপ্রাচ্যে একতরফানীতি, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের স্পষ্ট অবস্থান জানাতে ব্যর্থ হওয়াসহ প্রত্যেকটা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের সমর্থনের বাইরে চলে গেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এমনকি এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কামালা হারিসকে কটু কথা বলতেও ছাড়েনি ট্রাম্প। তবে ট্রাম্প যেসব বিষয়ে বিতর্কিত হয়েছে সেসব বিষয় কৌশলে নিজ আয়ত্তে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জর্জ ফ্লোয়েডকে কেন্দ্র করে বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভে সরাসরি জনগণের পক্ষে সমর্থন দেন এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট ক্যান্ডিডেট জো বাইডেন। এমনকি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট করেন। সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনি সমীক্ষায় দেখা গেছে ট্রাম্পের থেকে বাইডেন এগিয়ে আছে। জনমত বিবেচনা এবং ২০১৬ সালে নির্বাচনে জয় লাভের পর থেকে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে এবারের নির্বাচনে তিনি জয় লাভ করবেন কি না বলা মুশকিল। মজার ব্যাপার হলো—২০১৬ সালের জরিপকে মিথ্যা প্রমাণ করে নির্বাচনে জয়ের মালা পরেছিল ট্রাম্প। তার সমর্থকরা বিশ্বাস করে এবারো সব জরিপ মিথ্যা প্রমাণ করে জয় লাভ করবেন ট্রাম্প। সর্বশেষ, এবারের নির্বাচনে কে জিতবে কে হারবে সাধারণ সমীক্ষায় যদিও অনুমান করা যায় কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। বিশ্বের অন্যতম এই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনের জয়ের মুকুট কার মাথায় উঠবে নির্ধারিত সময়ই সেটা বলে দিবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়