প্রতিদিন পত্রিকা খুললে অজস্র নারী নির্যাতনের চিত্র চোখে পড়ে। পরিসংখ্যান পড়িয়ে পাঠককে আর বিরক্ত করতে চাই না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্যাতক ঘরের মানুষ এবং কিছু কিছু নিদারুণ ঘটনা ঘটার পর পত্রিকাতে নারী নির্যাতন নিয়ে লেখার ছড়াছড়ি পড়ে যায়। অধিকাংশ লেখাতেই নারী রাম আর নির্যাতক রাবণ। একটি পুরুষের সাফল্যের পেছনে যেমন নারীর অবদান আছে, বলা বাহুল্য একটি পুরুষের নারী নির্যাতন করার পেছনে একটি নারীর অবদানও অনস্বীকার্য।
এই বিষয়টা বুঝতে হলে বাস্তবতার দিকে নজর দিতে হবে। একটি শিশু যখন বেড়ে ওঠে তখন পরিবার থেকেই সর্বপ্রথম শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। পারিবারিক আবহ শিশুর মানসিক গঠনের একটা ছাঁচ তৈরি করে। পরবর্তীকালে শিশু যখন বাইরের পরিবেশের সঙ্গে মেশে তখন সেই ছাঁচে সবকিছু বিবেচনা করতে চায়। কেউ কেউ বাস্তবতা ও মানসিক দ্বন্দ্বে নতুন আরেকটি ছাঁচ তৈরি করে নেয়। সবসময়ই যে পারিবারিক পরিবেশ বা শিক্ষা অনুযায়ীই চলবে এমনটা নয়। এই পরিবর্তন ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয়ই হতে পারে। কোনো শিশু পরিবারের সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ ত্যাগ করে অন্ধকার ভুবনে পা বাড়াতে পারে কিংবা পারিবারিক অসুস্থ শিক্ষা ত্যাগ করে বাস্তবিক ও সুন্দর চিন্তাভাবনার দুনিয়া তৈরি করে নিতে পারে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে এটা খুব কম মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটে। এজন্যই আমাদের দেশের মানুষ কথায় বলে থাকে জাতের দোষ বা বংশগত দোষ!
নেপোলিয়ানের একটি উক্তি কম-বেশি সবারই জানা। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’ শিক্ষার সংজ্ঞা আপেক্ষিক। সক্রেটিসের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না তবুও তিনি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। মায়ের শিক্ষার ব্যাপারটাও আপেক্ষিক বিষয়। একজন মায়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকতে পারে কিন্তু মা যদি স্বশিক্ষিত হন, তবে আশা করা যায় আমরাও অনুরূপ জাতি পাব। মানুষ স্বশিক্ষিত হয় মূলত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ও বাস্তবতা অনুধাবন করে। বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ নারীরই নিজ ঘরে নির্যাতিত; এ ক্ষেত্রে ঘরের নারীর মনমানসিকতাও কম দায়ী নয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, আমরা নারী নির্যাতনকে পারিবারিক সংস্কৃতি হিসেবে দেখে আসছি। আর এই পরিবারের সন্তান যখন বাইরের জগতে যায় তখন সেখানেও এই সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে চায়। কিছু বাস্তবিক উদাহরণ দিলেই চিত্রটি সহজে বোঝা যাবে। যেমন কিছু মহিলা যখন স্বামী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হন তখন তারা কাঁদে ও কষ্ট পায়। কিন্তু যখন ঐ মহিলার মেয়েও অনুরূপভাবে নির্যাতিত হয় তখন তারা বলে পুরুষ মানুষ এমনই হয়। এতটুকু সহ্য করেই মেয়েদের চলতে হয়। পাঠক ধারণা করতে পারেন—এমন ঘটনা গ্রামেই হয়। তবে করুণ সত্য হলো, শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল মেয়েদেরকেও শেখানো হয় যে পুরুষের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়, একটু আধটু না গায়ে হাত তুললে সে আবার কীসের পুরুষ! তফাত হলো শিক্ষিত মেয়েরা এটা প্রকাশ করতে চায়।
গত দুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভেসে বেড়াচ্ছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে প্রকাশ্যে প্রায় নগ্ন একটি বালক একটি নারীকে ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে। সমাজে নৈতিক শিক্ষার কতটা অবক্ষয় হলে দিনদুপুরে এমনটা ঘটে! পচে যাওয়া সমাজকে ফিরিয়ে আনতে হলে পরিবারকেও কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে। একজন ধর্ষক ও নারী নির্যাতনকারীর অপরাধের পেছনে পরিবারেরও দায় আছে। যেহেতু আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মা-ই সন্তানের প্রথম শিক্ষক, তাই মাকে হতে হবে সচেতন। আমাদের সমাজে একটি ছেলেশিশুকে যখন বাইরে খেলতে পাঠানো হয় তখন মেয়েশিশুকে পাঠানো হয় হেঁশেলের কাজে। দৃশ্যটা কেমন হয়, যদি ছেলেমেয়ে উভয়কেই ঘরের কাজ শিখিয়ে তারপর একসঙ্গে খেলতে পাঠানো হয়?
পরিবার আরেক দফা বৈষম্য করে বিয়ের সময়। বর্তমানে মেয়েদের শিক্ষার হার বেড়েছে বটে তবে এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ নারীকে পাশের একটা ট্যাগ দেওয়া হয়, যতটা না শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল করার উদ্দেশ্য, তার চেয়ে বেশি সুপাত্রস্থ করার নিমিত্তে। নারীদের উন্নতির জন্য দরকার পরিবারের অন্য নারীদের সহযোগিতা। প্রবাদে বলে, চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম। একটি সু্ন্দর পারিবারিক পরিবেশই পারে সুন্দর সমাজ গঠনে সাহায্য করতে।
n লেখক: wk¶v_©x, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।