একটি ‘অস্বস্তিকর’ আখ্যান

ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ-২০২০ পেয়েছেন ডাচ ঔপন্যাসিক  ম্যারিকে লুকাস রিজনেভেল্ড, তাঁর প্রথম উপস্যাস ‘দি ডিসকমফোর্ট অব ইভেনিং’-এর জন্যে। মাত্র ২৯ বছর বয়সে এমন অর্জন তাঁকে সবচেয়ে কম বয়সি বুকারজয়ীদের তালিকার শীর্ষে নিয়ে গেছে। এরচেয়েও গৌরবের বিষয়, ম্যারিকেই প্রথম কোনো ডাচ লেখক যিনি এই পুরস্কারে ভূষিত হলেন। সংগত কারণেই নেদারল্যান্ডসে তাঁকে নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। তাছাড়া বিশ্বের বনেদি পত্রিকাগুলো তাঁর সাক্ষাত্কার ছেপে চলছে, তাঁর উপন্যাস নিয়ে নানামাত্রিক আলোচনাও ছেপেছে বিভিন্ন জার্নাল ও পত্রিকা। এই লেখাও বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার এক প্রয়াস।

প্রথমেই বলি, ‘দি ডিসকমফোর্ট অব ইভেনিং’-এর ইংরেজি অনুবাদ করেছেন মিশেল হাচিসান। উপন্যাসের শুরুর দিকে কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই মনে হলো, এতে ঔপন্যাসিকের ব্যক্তিগত জীবনের আঁচ আছে; বলতে গেলে, অনেকটা সেমি অটোবায়োগ্রাফিক্যাল ধাঁচের আখ্যান এটি। পরবর্তী সময়ে ‘দি গার্ডিয়ান’ পড়ে জানলাম, ঔপন্যাসিকের বড়ো ভাইয়ের মৃত্যু এ উপন্যাসের প্লটকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর সময় নিয়ে লেখা এ বইতে ম্যারিকে লুকাস নানা বিষয়কে একটা ক্যানভাসে এনেছেন। তাঁর বেড়ে ওঠার সময়কাল, খ্রিস্টধর্মের প্রটেসটান্ট অনুশাসন, ধর্মীয় গোড়ামি-ভীতি প্রভৃতি বিষয় এ উপন্যাসের অবয়ব গড়েছে।

একাকীত্ব, ভালোবাসাহীনতা, অস্বস্তি, শারীরিক চাহিদার অবদমন প্রভৃতি বিষয়সমূহ কিংবা বোধগুলো এ উপন্যাসের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এ বইয়ের মূল চরিত্র ও কথক জেস। তার বয়ানে শুনতে হয় পুরো গল্প। জেস তার জীবনের অদ্ভুত অথচ সত্য সব ঘটনার বর্ণনা দেয়। শুরুতেই দেখা যায়,  ক্রিস্টমাসের মাত্র দু দিন আগে জেস খুব বিষণ্ন, কারণ তার ভাই তাকে আইস স্কেটিং-এ নিয়ে যায়নি। রেগেমেগে সে বলে বসল, ভাই মরুক গিয়ে। নিশ্চয় প্রচণ্ড রাগ থেকেই সে এমনটি বলেছে, মন থেকে বলেনি। অথচ, কাকতালীয়ভাবে আইস স্কেটিং করতে গিয়ে এক দুর্ঘটনায় মারা যায় তার ভাই। তাদের পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া, যা তারা কোনোদিন কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এটিই উপন্যাসের ক্লাইমেক্স। এ প্রসঙ্গে ম্যারিকে লুকাস বলেন, কোনো পরিবারে আপনজনের মৃত্যু হলে দেখবেন দুটো ব্যাপার ঘটে—এক, হয় ঐ পরিবারের সবাই একে অপরের খুব কাছে আসে বা থাকার চেষ্টা করে, নতুবা সবাই খুব বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়টি হয়েছে জেসের পরিবারের বেলায়। তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর জেস তার গায়ে থাকা কোট আর খুলতে চায় না; তার ধারণা, কোট খুললেই সে মৃত্যুর দাস হয়ে যাবে, কিংবা মৃত্যু ধেয়ে আসবে তার দিকে। আবার একপর্যায়ে দেখা যায়, জেস ও তার অন্যান্য ভাইবোন নানা উপায়ে মৃত্যুর স্বাদ নিতে চায়। যেমন—জেস কন্সিটিপেশানের পথ বেছে নেয়, ভাবে, এটাই তার মৃত্যু আনবে। অন্যান্য ভাইবোনেরা ভাবে কীভাবে তাদের বাবা-মায়ের মৃত্যু হবে—গাড়ি দুর্ঘটনায়, আগুনে পুড়ে, নাকি কারো দ্বারা খুন হয়ে ইত্যাদি নানা অদ্ভুত বিষয়! অর্থাত্ তাদের ভাইয়ের মৃত্যুর পর জেসসহ সব ভাইবোন স্বাভাবিক উপায়ে মৃত্যুর কথা ভাবতে পারে না।

জেসের পরিবারের সদস্যদের বিষণ্নতা, একাকীত্ব, অসহায়ত্ব ও অস্বস্তিবোধ তাদের এক ভিন্ন জগতের বাসিন্দা করে তোলে। এসবের পেছনে ধর্মীয় অনুশাসন, বিধিনিষেধকে দায়ী করেছেন ঔপন্যাসিক। তাছাড়া মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও শারীরিক চাহিদার মতো বিষয়সমূহকে অবদমন করা হয়েছে চার্চ কর্তৃক প্রণীত আইনের দোহাই দিয়ে। যেমন—এক অধ্যায়ে জেস বলছে, ‘আমার বাবা-মা কোনোদিন আবেগ-অনুভূতির মূল্য দেয়নি। তাদের কাছে এসব বিষয় বোধ হয় পাপের শামিল। এমনকি তারা কোনোদিন হয়তো একে অপরকে হূদয় উজাড় করে আলিঙ্গনও করেনি, পাছে লোকে দেখে ফেলে। তাই আমি নিজেকেও আলিঙ্গন করতে ভয় পাই, যদি গোপন কিছু বের হয়ে যায়।’

শেষে বলি, এ উপন্যাস লেখে খানিকটা যে বিপাকে পড়েছেন ঔপন্যাসিক সে ব্যাপারটি। এ বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে ম্যারিকে লুকাস রিজনেভেল্ডের পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, কারণ এর বিষয়-আশয় তাঁর পরিবারের চিরায়ত ধ্যান-ধারণার পরিপন্থি। তাছাড়া অনেক সাক্ষাত্কারেই রিজনেভেল্ড বলেছেন, তিনি নারী বা পুরুষ কোনোটাই নয়, বরং তিনি এ দুটোর মাঝামাঝি কিছু একটা। কিন্তু তাঁর বাবা-মা তো তাঁকে বড়ো করেছেন একজন মেয়ে হিসেবে, আবার শৈশবে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে ছেলে ভাবত। হঠাত্ রিজনেভেল্ডের এমন কথায় তাঁর বাবা-মাসহ গ্রামবাসী অবাক ও মর্মাহত হয়েছেন। তিনি এই আশাহতের কারণ হিসেবে বলেছেন, ‘আমার বর্তমান পরিচয়ের কথা বাইবেলে উল্লেখ নেই। ফলে বাবা-মা এবং অন্য সকলে যাঁরা আমায় চেনেন তাঁরা ব্যথিত হবেন এটাই স্বাভাবিক।’ বাইবেলের বাইরেও জীবন আছে এমন ইঙ্গিতই দিয়েছেন ঔপন্যাসিক এ গল্পে। এদিক বিবেচনায় এ আখ্যানটি খানিকটা বিপ্লবাত্মকও।