নজরুলের সংগীত

কাজী নজরুল ইসলাম গভীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছেন, ‘সঙ্গীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি। বিভিন্ন দিক থেকে ও নানাভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এর চাইতে বড়ো সত্যি তার কিছু হয় না। বাংলা গানের জগতে তিনি প্রায় সকল আঙ্গিকের ও সব ধরনের গান রচনা করেছেন।

বাংলা গানের এমন কিছু ধারা আছে, যা নজরুলের অবদানে কেবল সমৃদ্ধই হয়নি, স্থায়িত্বও পেয়েছে। যেমন ইসলামি গান। মুসলমানদের ধর্মীয় সমস্ত উত্সবে গাওয়া ছাড়াও এখন শিল্পীদের নিয়মিত পরিবেশনায়ও এই গান গীত হচ্ছে। হিন্দুধর্মীয় ভজন-কীর্তন শ্যামাসংগীতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এসব ধর্মীয় গান এখন সর্বধর্মের মানুষের সর্বজনীন চর্চার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নজরুলের ধর্মবিষয়ক গান ছাড়া আজ কোনো ধর্মের কোনো অনুষ্ঠান পূর্ণতা পায় না।

আবার শাস্ত্রীয় সংগীতের চারটি ধারা—ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরির চর্চা একসময় শুধু ওস্তাদদের নিজস্ব ঘরানা আর বৈঠকি গানের আসরে সীমাবদ্ধ ছিল। নজরুল বাংলা ভাষায় এসব পর্যায়ের গান রচনা করার ফলে এগুলোও সব শ্রেণির গায়কের কাছে সমাদৃত হয়েছে।

নজরুল বাংলায় গজল অঙ্গের গান রচনা করার ফলে ভিন ভাষার একটি গানের ধারা বাংলা গানে সগৌরবে স্থান করে নিতে পেরেছে। নজরুলের হাতে বাংলা গজল গান সার্থকতা লাভ করেছে। নজরুল বাংলা গজল গান রচনা না করলে গানের এই ধারাটি উপেক্ষিত থাকত। নজরুল বাংলা সংগীতে তাঁর এ অবদান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাই ১৯৩৮ সালে ‘দৈনিক কৃষক’ পত্রিকার অফিসগৃহে জন-সাহিত্য সংসদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘...এ প্রসঙ্গে আমার নিজের বিষয়ে কিছু বক্তব্য আমার আছে। কাব্যে ও সাহিত্যে আমি কি দিয়েছি জানি না। আমার আবেগে যা এসেছিল, তাই আমি সহজভাবে বলেছি, আমি যা অনুভব করেছি, তাই আমি বলেছি। ওতে আমার কৃত্রিমতা ছিল না। কিন্তু সঙ্গীতে যা দিয়েছি, সে সম্বন্ধে আজ কোনও আলোচনা না হলেও ভবিষ্যতে যখন আলোচনা হবে, ইতিহাস লেখা হবে, তখন আমার কথা সবাই স্মরণ করবেন, এ বিশ্বাস আমার আছে। সাহিত্যে দান আমার কতটুকু তা আমার জানা নেই। তবে এইটুকু মনে আছে সঙ্গীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি।...’

এমন আরো একটি মন্তব্য কাজী নজরুল ইসলাম করেছিলেন ‘কৃষক’ পত্রিকার ১৩৪৬ বঙ্গাব্দের ঈদুল ফিতর সংখ্যায় সাহিত্যিক ইজাবউদ্দীন আহমেদকে (১৯১৮-১৯৭৭ খ্রি.) দেওয়া সাক্ষাত্কারে। তাতে এক প্রশ্নের জবাবে নজরুল বলেন, ‘আমার রচিত সাহিত্য কতখানি মূল্য পাবে তা আমি জানি না। তবে বাংলার সঙ্গীত ক্ষেত্রে আমি কিছু দান করেছি।’

নিজের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে কতটা আত্মবিশ্বাসী হলে কেউ এমন মন্তব্য করতে পারেন, সেটা ভাবার বিষয়। নজরুলের নামের আগে কবি, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, ঔপন্যাসিক অভিধাগুলোর প্রয়োগ যতটা তার চেয়ে বেশি সার্থক হলো ‘সংগীতজ্ঞ’ এই অভিধাটি। অবশ্য তাঁর কবি ও সংগীতজ্ঞ সত্তা দুটি একে অপরের পরিপূরক।

সংগীতভুবনে তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, স্বরলিপিকার, বাদ্যযন্ত্রী, সংগীত গবেষক, সংগীত প্রশিক্ষক, অনুবাদক, গীতিনাট্য রচয়িতা, রাগস্রষ্টা, লক্ষণগীতস্রষ্টা, তাল-ছন্দ স্রষ্টা, সংগীত আলেখ্য রচয়িতা, সংগীত প্রতিযোগিতার বিচারক, চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক ইত্যাদি।

কাজী নজরুল ইসলামের গানের সংখ্যা ৩,১৭৪টি (প্রাপ্তমতে), সুর করেছেন প্রায় ৬০০টি গান, রেকর্ডে কণ্ঠ দিয়েছেন ৩২টি গানে, স্বরলিপি করেছেন ৪১টি গানের, বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন ৭টি, সংগীত বিষয়ক গ্রন্থ ২০টি, রাগ সৃষ্টি করেছেন ১৭টি, লক্ষণগীত সৃষ্টি করেছেন ৫টি রাগের, তাল-ছন্দ সৃষ্টি করেছেন ১০টি। তাঁর গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ৩৩১ জন শিল্পী, গান রেকর্ড হয়েছে ২,১৬০টি, সুর করেছেন ৪৪ জন, স্বরলিপিকার ২৮ জন, রেকর্ডকৃত কোম্পানি ১১টি, ব্যবহূত রাগ ২৭৬টি, ব্যবহূত তাল ৩৬টি। সবকিছু এক মহা সংগীতযজ্ঞ।

যে সংগীত নিয়ে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে অর্থাত্ তাঁর বয়স যখন ৩৯ বছর, নজরুলকে এতটা আত্মবিশ্বাসী হতে দেখা যায়, তার শুরু কিন্তু তাঁর বাল্যজীবনে, ১০-১১ বছর বয়সে, আঞ্চলিক লেটোগান দিয়ে। অর্থাত্ নজরুলের সমগ্র জীবনই সংগীত, সমস্ত কিছুই নজরুলের সংগীত।