৪ঠা সেপ্টেম্বর ২০২০, আমাদের বাবা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সংবিধানপ্রণেতাদের অন্যতম, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত (মরণোত্তর) এম আব্দুর রহিমের ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী। বাবার জন্ম ২১ নভেম্বর ১৯২৭, দিনাজপুর সদর উপজেলার জালালপুর গ্রামে। পড়ালেখা শেষ করে ১৯৬০ সালে দিনাজপুরে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। ১৯৫২ সালে রাজশাহী কলেজের ছাত্র থাকাবস্থায় ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। আইন পেশায় সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করলে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে বাঙালির স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান অবিস্মরণীয়। ১৩ই এপ্রিল ১৯৭১ পর্যন্ত দিনাজপুর হানাদারমুক্ত ছিল। ২৬শে মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাবাকে আহ্বায়ক করে দিনাজপুরে ‘মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। মানবিক মূল্যবোধ আর দেশাত্মবোধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পতিরাম, রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, বালুরঘাট, গঙ্গারামপুরসহ বিভিন্ন এলাকার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৭১-এর ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য ১১টি জোনে ভাগ করা হয়। বাবা পশ্চিম জোন ১-এর জোনাল চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন সংশ্লিষ্ট জোনের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের দ্বারা। শরণার্থী শিবিরের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, ইয়ুথ ক্যাম্প পরিচালনা, মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্ট এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল তার ওপর। দেশ হানাদারমুক্ত হওয়ার পর বাবা ১৭ই ডিসেম্বর সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে পশ্চিম জোন ১-এর চেয়ারম্যান হিসেবে বগুড়া জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৮ই ডিসেম্বর বেলা ১১টায় দিনাজপুর গোর-এ-শহিদ বড় ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন দেশে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় মিত্রবাহিনীর এই অঞ্চলের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার ফরিদ ভাট্টি ও কর্নেল শমসের সিংয়ের নেতৃত্বে একটি চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। স্বাধীনতার পর তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চল পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির চেয়ারম্যানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চলাকালে বাবার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে তত্কালীন পাকিস্তানি সেনাশাসক তথাকথিত সামরিক ট্রাইব্যুনালে একতরফা বিচার করে সাজা প্রদান করে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির ৩৪ জন সদস্যের অন্যতম সদস্য হিসেবে সংবিধান প্রণয়নে অবদান রাখেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন, তখন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক শাসকদের কোনো প্রলোভনই তাকে বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ’৭৫-পরবর্তীকালে বেগম জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হলে তিনি কমিটির সদস্য এবং পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসনবিরোধী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামরিক শাসক গোষ্ঠী তাকে গ্রেফতার করে দীর্ঘদিন কারাগারে আটক রাখে।
বাবা ১৯৯১ সালে দিনাজপুর সদর আসন থেকে পুনরায় জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি দীর্ঘদিন দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দিনাজপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালে চাঞ্চল্যকর কিশোরী ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনের বলিষ্ঠতা তাকে দিনাজপুরের গণমানুষের কাছে আলোকিত করে। বাবা সিভিল ল’ইয়ার হিসেবে জেলার প্রথম সারির কয়েক জনের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। আইন পেশায় তার রোজগারও কম ছিল না। কিন্তু রাজনীতি-সমাজসেবা করতে গিয়ে বাবার সম্পত্তি কমেছে, বাড়েনি; সম্পত্তি বিক্রি করেছেন। বর্তমান সময়ে জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হওয়ার পরপরই রাজউকের একটি প্লট পাওয়ায় জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বাবার নামে রাজউকের কোনো প্লট ছিল না কিংবা রাজধানীতে অন্য কোনো জায়গা-সম্পত্তিও ছিল না। বাবাকে যখন বলতাম, পেশাগত কারণে আমাদের তো ঢাকায় থাকতে হবে, জায়গা কেনা প্রয়োজন; তখন তিনি বলতেন, ‘আমি কৃষকের ছেলে, লেখাপড়া শিখে দিনাজপুর শহরে বাড়ি করেছি, তোমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছি, যদি পারো তোমরা তোমাদের টাকায় ঢাকায় বাড়ি করিয়ো।’
বাবা আমাদের ভাইবোনদের নিজের সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও মানবিকতার আদর্শে বড় করতে চেষ্টা করেছেন। বাবার মৃত্যুর পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষের অভিপ্রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজটির নাম ‘এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ’ এবং মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করায় তার প্রতি দিনাজপুরবাসী এবং আমাদের পরিবার কৃতজ্ঞ।
বাবা খসড়া সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন; মূল সংবিধানে স্বাক্ষর করেছেন। বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় শপথ নিয়েছি, ‘সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান’ এবং ‘ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সকলের প্রতি আইন-অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ’ করার। সংবিধান হাতে নিলে প্রতিটি শব্দে, বাক্যে, অনুচ্ছেদে বাবার স্পর্শ-অস্তিত্ব অনুভব করি। এ অনুভূতি যেমন প্রচণ্ড আবেগ সৃষ্টি করে, তেমনি সংবিধান রক্ষা এবং শপথ অনুযায়ী বিচার করার কঠিন দায়িত্ব ও কর্তব্যটিও স্মরণ করিয়ে দেয়। বর্তমানে বাবার স্মৃতি ও কর্ম আমার পথ চলার প্রেরণা।
n লেখক :বিচারপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বাংলাদেশ।