ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইংল্যান্ডের রাজা জন এবং ব্যারনদের দ্বন্দ্ব হইতে রয়েল চার্টার হিসাবে ম্যাগনা কার্টা রচিত হইয়াছিল। তাহাও রচনা করিয়াছিলেন ইংল্যান্ডেরই শাসকশ্রেণি, সাধারণ জনগণ নহে। সেই ম্যাগনা কার্টা আজও গণতন্ত্রের সূচনাপত্র হিসাবে বিশ্বব্যাপী বিবেচিত হইয়া থাকে। কালক্রমে সংস্কার হইয়াছে পশ্চিমা দেশসমূহের গণতন্ত্র। তাহারা উহা রপ্তানিও করিতে চাহিয়াছেন বিশ্বের আনাচকানাচে—সকল সমাজ, সকল দেশের জন্য। ঘটনাক্রমে আমরাও গণতন্ত্র বলিয়া একটি পন্থা গ্রহণ করিয়াছি। কিন্তু সিস্টেম হিসাবে তাহাকে কি আমরা পশ্চিমা গণতন্ত্রের সঙ্গে মিলাইতে পারি? না, উহা মিলে নাই। আমরা শুধু বাংলাদেশের কথা বলিতেছি না। উপমহাদেশ তথা তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের একই চিত্র। সেই সঙ্গে আমরা ইহাও উপলব্ধি করিতে পারি না যে, পশ্চিমা দেশে যাহা চলে, এইখানে তাহা চলিবে না। তাহা হইলে এই সকল দেশে কী ধরনের সরকারব্যবস্থা থাকিবে উহা লইয়াই আইনপ্রণেতা, আইন বিশেষজ্ঞদের নূতন করিয়া ভাবিয়া দেখিবার প্রয়োজন রহিয়াছে।
এইখানে লোকে রাজনীতি করে। সেই রাজনীতিতে কোনো লক্ষ্য নাই, কোনো আদর্শ নাই, কোনো প্রতিশ্রুতি নাই। সকলেই জানে, দল যখন ক্ষমতায় থাকিবে তখন দলের হইয়া বেনিফিট গ্রহণ করিতে হইবে। আসন পাতিয়া বসিয়া আয় করিতে হইবে। আর দল যখন ক্ষমতায় থাকিবে না তখন এই আসন থাকিবে না। তখন কোনো কাজ থাকিবে না, ক্ষমতাসীনদের পিছনে ঘুরিয়া যতটুকু করুণা আদায় করা যায়। ইহা একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ইহাকে আর যাহাই হউক গণতন্ত্র বলা যায় না। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেই সকল দেশে রহিয়াছে, তাহাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে সুস্থভাবে পরিচালনা করা একটি চ্যালেঞ্জ হইয়া দাঁড়ায়। এই সকল দেশে কোনো দল সরকারের দায়িত্ব নিলে তাহাকে ক্ষমতা বলি। প্রশ্ন হইল, দেশে জনগণের যেই অংশ সরকারে থাকা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নহে, অথবা সমর্থক নহে তাহারা কি ক্ষমতাহীন বলিয়া বিবেচিত হইবে? এই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে লক্ষ করা যায় সকল কিছু কুক্ষিগত করিবার একটি প্রবণতা তৈরি হয়, যাহা মোটেই গণতান্ত্রিক মানসিকতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নহে। যে কোনো দেশেই শাসনকার্য পরিচালনার জন্য একটি পদ্ধতি থাকে, যাহাকে দেহের অর্গানের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তৃতীয় বিশ্বের এই সকল দেশে যাহারা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেন তাহাদেরই একটি অংশ এই অর্গানগুলিকে অকার্যকর করিয়া তুলে।
অবশ্যই ইহা স্বীকার করিতে হইবে রাজনৈতিক দলের উচ্চ মহল হইতে কেহ কেহ, কখনো কখনো দলের শুদ্ধাচারের ব্যাপারে ইতিবাচক চিন্তা করিয়া থাকেন। কিন্তু তাহা বাস্তবায়ন কতটা কঠিন উহা উপলব্ধি করা যায়। এই সকল সমস্যা আমরা বিশ্বমানচিত্রের যত পূর্বের দিকে তাকাই, তত প্রকট দেখিতে পাই। বলা হইয়া থাকে, বিশ্বব্যাপী যত শাসনব্যবস্থা রহিয়াছে—রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র যাহাই বলি না কেন— গণতন্ত্রই সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা। কিন্তু এই গণতন্ত্র যেই সকল সমাজের জন্য যথোপযুক্ত নহে, তাহাদের জন্য কী ব্যবস্থা?