মোহাম্মদ ইলিয়াছ
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের যে কোনো দেশে মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য সাক্ষরতার হার অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাক্ষর শব্দের অর্থ হচ্ছে অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি। অনেকেই মনে করে থাকেন যে, কোনোমতে নাম সই করতে পারলেই সাক্ষর বলে গণ্য হয়। দস্তখত দিতে পারে অথচ তার বাইরে কোনো লিখিত শব্দ পড়তে পারে না—এমন ব্যক্তিকে সাক্ষর বলা যায় না। ইউনেস্কোর সংজ্ঞানুযায়ী, যে ব্যক্তি তার দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কিত সহজ বিবরণ পড়ে বুঝতে এবং লিখতে পারে—সে-ই সাক্ষর। ব্যক্তি নিজ ভাষায় ও ছোট বাক্য পড়তে পারবে, সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারবে তার ওপর ভিত্তি করে সাক্ষরতার হিসাব-নিকাশ করা হয়। বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের আগ পর্যন্ত সাক্ষরতার মাপকাঠি ছিল ভিন্নতর। ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে সাক্ষরতার সংজ্ঞা ছিল স্পষ্ট ছাপার অক্ষরে লেখা কোনো ভাষার বাক্য গঠনের ক্ষমতা। ১৯৬১ সালের আদমশুমারিতে সাক্ষরতার ধারণা কিছুটা পালটিয়ে বলা হয়, যে বুঝে পড়তে পারবে সে-ই সাক্ষর। বিবিএসের মতে, একজন ব্যক্তি পড়তে ও নিজের নাম লিখতে পারলেই সাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন ধরে নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সংজ্ঞানুযায়ী, সাক্ষরতা হলো পড়ার পাশাপাশি অনুধাবন করা, মৌখিকভাবে ও লেখার বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যাখ্যা করা, যোগাযোগ স্থাপন করা এবং গণনা করার দক্ষতা। যে যেভাবে সাক্ষরতার সংজ্ঞা দিক না কেন সাক্ষরতার হার ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সাক্ষরতা গভীরভাবে সম্পর্কিত। সাক্ষরতার হার মানব সম্পদ উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি। এদেশে নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাক্ষরতা বৃদ্ধির প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ১৯৯১ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে করা হয় বাধ্যতামূলক। ফলে বাড়তে থাকে সাক্ষরতার হার। ১৯৯১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৩৫.৩ শতাংশ। ২০১০ সালে ৫৯.৮২ শতাংশ। ২০১৯ সালে উন্নীত হয়েছে ৭৩.৯ শতাংশে। বর্তমানে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার যদি ৭৪ শতাংশ হয়, তাহলে বলতে হবে এক চতুর্থাংশের বেশি লোক মুক্ত হতে পারেনি নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে। নিরক্ষরতা একদিকে ব্যক্তিগত সমস্যা, অন্যদিকে সামাজিক থেকে রাষ্ট্রীয় সমস্যার কারণ। অক্ষরজ্ঞানহীনতার জন্য মানুষ যেমন জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো থেকে নিজেকে বঞ্চিত করছে, তেমনি চিন্তাচেতনার দিক থেকে অন্ধকার যুগের বাসিন্দা হয়ে রয়েছে।
জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজিতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ২০৩০ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার শতভাগে উন্নীত করতে। ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে এবং বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতার আওতায় আনা জরুরি। বিশেষ করে এই নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতা, জীবন দক্ষতা ও কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ দিতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে সাক্ষর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বর্তমান সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। তবে খেয়াল রাখতে হবে— সাক্ষরতা কার্যক্রম প্রসারের কাজ একটা প্রবাহমান ধারার মতো, কখনোই তা থেকে সরে আসা যাবে না।
চট্টগ্রাম