নাব্যসংকট ও চলাচলে অনিশ্চয়তা

পদ্মা নদীতে নাব্যসংকটের কারণে গত বৃহস্পতিবার হইতে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী-মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল পুরাপুরি বন্ধ হইয়া গিয়াছে। ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় দুই পাশে আটকা পড়িয়াছে পণ্যবাহী শত শত ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন। চরম ভোগান্তিতে পড়িয়াছেন অ্যাম্বুলেন্সে আসা রোগীরা। যাত্রীবাহী পরিবহন নূতন করিয়া না আসিলেও পণ্যবাহী পরিবহন আসিবার গতি এখনো অব্যাহত আছে। এই রুটে অচলাবস্থা সৃষ্টির কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে বাড়িয়াছে বিভিন্ন প্রকার যানবাহনের চাপ। এই নৌপথের পাটুরিয়া প্রান্তে ডুবোচরের পাশাপাশি নাব্যসংকট দেখা দিয়াছে। ইহাতে রো রো (বড়) ফেরিগুলি মারাত্মক ঝুঁকি লইয়া চলাচল করিতেছে। ইহার কারণেও উভয় ঘাটে বৃদ্ধি পাইয়াছে যানজট। মাত্র তিন কিলোমিটারের দীর্ঘ নৌপথ পাড়ি দিতে আসিয়া ফেরির নিকট সিরিয়ালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটেই আটকা পড়িয়া থাকিতেছে বিভিন্ন গাড়ি। ইহাতে দুর্ভোগের অন্ত নাই।

দক্ষিণ-বাংলায় নৌযোগাযোগের বিশেষ গুরুত্ব রহিয়াছে। এই বিশাল অঞ্চল বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িলে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ে তাহার নেতিবাচক প্রভাব। কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ হইবার পর মাত্র এক দিনের ব্যবধানে পিঁয়াজের দাম কেজিতে ২০ টাকা বাড়িয়াছে। বাড়িয়াছে বিভিন্ন প্রকার শাকসবজির দামও। বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহন আটকা পড়িয়া থাকিবার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। এই অবস্থা আরো কয়েক দিন ধরিয়া চলিলে অনেক পচনশীল দ্রব্য পচিয়া গিয়া সমূহ অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হইয়া দাঁড়াইবে। বিআইডব্লিউটিসি বলিতেছে, বর্ষা মৌসুমে কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌপথের লৌহজং টার্নিং পয়েন্টের বিকল্প নৌ-চ্যানেল ও পদ্মা সেতুর চায়না চ্যানেলে সৃষ্টি হইয়াছে বিপজ্জনক ডুবোচর। দুর্ঘটনা এড়াইতে তাই ফেরি চলাচল বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। তবে ফেরি চলাচলে নূতন একটি চ্যানেল (পালের চর) বাহির করা হইয়াছে; কিন্তু এই পথে ঘুরিয়া চলাচল করিতে ছয়-সাত ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়। ইহা ছাড়া নূতন এই পথে শিমুলিয়া হইতে ফেরি কাঁঠালবাড়ী আসিতে পারিলেও বড় স্রোতের জন্য বড় ফেরিগুলি কাঁঠালবাড়ী হইতে শিমুলিয়া যাইতে পারে না। এই জন্য সংশ্লিষ্ট ঘাট কর্তৃপক্ষ এই বিকল্প পথে ফেরি চালু করিবেন কি না—তাহা লইয়া অনিশ্চয়তায় আছেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী লৌহজং টার্নিং পয়েন্টের বিকল্প নৌ-চ্যানেল ও পদ্মা সেতুর চায়না চ্যানেলে ১৪টি ড্রেজার বসাইয়া পলি অপসারণের কাজ চলিতেছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নৌ-চ্যানেলটি চলাচলের উপযোগী হইতে আরো কয়েক দিন লাগিতে পারে। দুর্ভোগ দ্রুত নিরসন করিতে হইলে প্রয়োজনে আরো একাধিক ড্রেজার আনিয়া খননকাজ চালাইয়া যাইতে হইবে।

আমরা জানি, প্রতিটি বড় ফেরি চলাচলের প্রয়োজনীয় গভীরতা না থাকিলেই নৌপথে সমস্যা তৈরি হয়। ইহার পাশাপাশি বর্ষার স্রোতে উজান হইতে ভাসিয়া আসা পলিবালি জমিয়া গেলে নৌপথের চ্যানেল অনেকটা সরু হইয়া পড়ে। এইভাবে ফেরির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। ডুবোচরের বালির ঘর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ‘প্রপেলার’ ও ‘বুশ’ ক্ষয় হইয়া ফেরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ফেরি তখন ঘন ঘন বিকল হইয়া পড়ে। এই সংকট নিরসনে ড্রেজিংয়ের বিকল্প নাই। ড্রেজিংয়ের সময় খেয়াল রাখিতে হইবে—নদীর পলিবালি কাটিয়া যেন আবার তাহা নদীতেই না ফেলা হয়। ইহা করিলে তাহা পণ্ডুশ্রমে পরিণত হইবে এবং নাব্যসংকট মোকাবিলার প্রচেষ্টা বৃথা যাইবে।