স্ক্রিন আসক্তি ও অনিদ্রা

আফজাল তাহফি রোহান

স্ক্রিন আসক্তির ফলে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অধিকাংশই ইনসোমনিয়ায় ভুগছে। তাদের সারারাত জেগে চলে ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রলিং, চ্যাটিং, গেমিং কিংবা মুভি দেখা। পাখির কিচিরমিচির কিংবা মুয়াজ্জিনের আজান শুনে যেখানে তাদের ঘুম ভাঙার কথা, সেখানে তারা তখন যাচ্ছে ঘুমোতে। একজন মানুষকে সুস্থ থাকার জন্য রোজ সাত-আট ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। কিন্তু তারা মোটে ঘুমোয় তিন-চার ঘণ্টা। ভোর ৫টায় ঘুমিয়ে সকালবেলার ক্লাস কিংবা কাজের চাপে সকাল ৭-৮টায় বিছানা ছাড়তে হয়। ফলে তাদের মানসিক ও শারীরিক উভয় স্বাস্থ্যই মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতি নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়াটাও একটি বিরাট সমস্যা এবং তা জটিল আকার ধারণ করছে। কারণ এটা বলা খুব কঠিন যে, কখন প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং কখনই বা তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে আসক্তির জন্ম দিচ্ছে। চিকিত্সা শাস্ত্রে আসক্তি বলতে বোঝায়, কোনো বস্তুর প্রতি মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং এর মধ্য দিয়ে এক ধরনের আনন্দ উপভোগ করা। মানুষ যখন কোনো বস্তুর দ্বারা আচ্ছন্ন বা বশবর্তী হয়ে যায়, তখন তার কাছে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলো যেমন—পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং দায়িত্ব-কর্তব্য সবই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। এর ফলে সেই মানুষটি যেমন সমস্যায় পড়ে, তেমন তার চারপাশে থাকা মানুষরাও নানা অসুবিধার সম্মুখীন হন। বাংলাদেশে সাধারণত ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সি ছেলেমেয়েদের এই ধরনের নেশায় আচ্ছন্ন হতে দেখা যায়। কারণ এরাই অতিরিক্ত পরিমাণে মোবাইল, কম্পিউটার, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম এই প্রযুক্তিগুলোর ভালো ও মন্দ দিক সম্পর্কে সম্যকরূপে ধারণা রাখে না। তাই তারা এর ভালো দিকটা বাদ দিয়ে চকচকে রঙিন মন্দ দিকটাই বেছে নিচ্ছে। দুনিয়ার অন্য দেশের তরুণরা যেখানে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রোডাক্টিভ কাজ করছে সেখানে আমাদের দেশের বর্তমান প্রজন্মের একটা বিশাল অংশ টিকটক ও লাইকি জাতীয় আনপ্রোডাক্টিভ সামাজিক মাধ্যমে তাদের সোনালি সময় নষ্ট করছে। বর্তমান সময়ে খেলার মাঠ কমে গেছে। তাই অনেক ছেলেমেয়েরা অনলাইন গেম খেলছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, যা হয়ে গেছে একটা প্রাত্যহিক রুটিনের মতো। মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞরা এহেন আসক্তিগত সমস্যাকে অন্যান্য নেশার মতোই বিবেচনা করেন। সাবস্ট্যান্স অ্যাবিউজের মতো টেকনোলজি অ্যাডিকশনও মানুষের একপ্রকার আচরণগত সমস্যা এবং নিজেকে বাস্তব বা সমাজ থেকে সরিয়ে রাখার মানসিকতাও এর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অন্য আসক্তির মতোই প্রযুক্তির প্রতি আসক্তিও মানুষের এক ধরনের অভ্যাস। যখন কেউ এই অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারে না, তখনই তা একজন মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে কুপ্রভাব ফেলে। নিদ্রার মতো স্বর্গসুখটাও তারা হারিয়ে ফেলে। রাত জাগার ফলে শরীরের বহুমাত্রিক সমস্যা হয়। বেশকিছু গবেষণায় দেখা গেছে, টানা দুই-তিন দিন ঠিক করে না ঘুমালে শরীরের অন্দরে এমন কিছু পরিবর্তন হতে শুরু করে যে তার প্রভাবে রক্তচাপ বাড়তে শুরু করে। টানা কয়েক দিন ছয় ঘণ্টার কম সময় ঘুমালে ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। কারণ ঘুম কম হলে নরমালি খিদে বাড়তে থাকে। বেশি মাত্রায় খেলে স্বভাবতই ওজন বাড়ে। আর ওজন যখন মাত্রা ছাড়ায়, তখন একে একে শরীরে এসে বাসা বাঁধে ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ এবং হার্টের রোগের মতো নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ। আমরা যখন ঘুমোই তখন আমাদের মস্তিষ্ক নিজেকে রিজুভিনেট করতে থাকে। সেই সঙ্গে সারা দিন ধরে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা এবং তথ্য ব্রেনে স্টোর করার কাজটাও এই সময় ঘটে থাকে। তাই তো ঠিকমতো ঘুম না হলে প্রথমেই স্মৃতিশক্তির ওপর প্রভাব পড়ে। সেই সঙ্গে কগনিটিভ ফাংশন কমে যাওয়ার কারণে মনোযোগ এবং বুদ্ধি কমে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলোও ঘটে থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কম সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। ঘুমের সঙ্গে হার্টের স্বাস্থ্যের সরাসরি যোগ রয়েছে। স্ক্রিন থেকে বের হওয়া গামা রশ্মি চোখের সুস্থতা কেড়ে নেয়। নিয়মিত রাত জাগার ফলে উপরিউক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও আরো নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। আমরা এখন উন্নত প্রযুক্তির যুগে বাস করছি এবং আমাদের চারপাশে সর্বত্রই এখন প্রযুক্তি ব্যবহারের ঝোঁক বেড়ে চলেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের জীবনযাত্রাকে ক্রমশ সহজ করে তুলছে। প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কখন যে এর সুফলের পরিবর্তে আমাদের জীবনকে অস্বাস্থ্যকর এবং আসক্তির মারাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা আমরা তরুণরা বুঝতেই পারছি না। প্রযুক্তির ব্যবহার যেখানে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকা জরুরি, তা আমাদের অজান্তেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেয়ে উলটো আমাদেরই নিয়ন্ত্রণ করছে। আমাদের নতুন প্রজন্মকে এই স্ক্রিন আসক্তি ও নিদ্রাহীনতার ভয়াল থাবা থেকে যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। নয়তো দেশের চলমান উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হবে। আগামীর বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে শির উঁচু করে দাঁড়ানোর পরিবর্তে মুখ থুবড়ে পড়বে।

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়