রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বাঁচাতে হবে

সাদিয়া আফরিন কুমু

ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ স্থান করে নিয়েছে প্রবাসী আয়ে শীর্ষস্থানে থাকা দেশের তালিকায়। বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপিতে প্রায় ১২ শতাংশ অবদান রেখে রেমিট্যান্স হয়ে উঠেছে দেশের উন্নয়ন ও মুদ্রার রিজার্ভ স্ফীতির উল্লেখযোগ্য অংশীদার ।

বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবাসী শ্রমিকরা পাঠিয়েছেন ১৬.৪২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রেরিত রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ১৮.২০ বিলিয়ন ডলারে, যা টাকার হিসেবে আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৫ হাজার কোটি বেশি। শুধু জুলাইতেই পাঠানো অর্থের পরিমাণ ২.৬ বিলিয়ন ডলার, মাসের হিসেবে যেটি তৈরি করেছে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠানোর নতুন রেকর্ড। করোনাকালীন প্রতিকূলতার মধ্যেও রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে প্রবাসী শ্রমিকরা দেশের দুর্দিনের কান্ডারি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। ১৬৯টি দেশে নিয়োজিত বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা ১.২ কোটি, যাদের তিন-চতুর্থাংশ নিয়োজিত রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, রেমিট্যান্স আয়ের তিন ভাগের দুই ভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দরপতন, দীর্ঘদিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটনশিল্প বন্ধ থাকায় সংকটে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো, যার দরুন কর্মী ছাঁটাই ও বেতন বন্ধসহ নানাবিধ সমস্যার শিকার হচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকেরা।

জনবান্ধব বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণার্থে নানান উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, লকডাউনের সময় ফেরত আসা শ্রমিকদের প্রত্যেককে সরকারি উদ্যোগে ৫ হাজার করে মোট ৩ কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ৪ শতাংশ হারে ২০০ কোটি টাকা ঋণদান প্রকল্পসহ আরো ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার নব্য পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। ঋণদান প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়নে চাহিদা ও যোগ্যতা বিচারের মাধ্যমে সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিতকরণে সরকারি মনিটরিং জোরদার করা আবশ্যক।  বিভিন্ন দেশ থেকে শ্রমিকদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো আটকাতে এবং ফেরত আসাদের পুনঃঅভিবাসনের জন্য সরকারকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক তত্পরতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনে দরকষাকষির মাধ্যমে গন্তব্য দেশগুলোতে বিকল্প শ্রমবাজার নিশ্চিত করতে হবে।

ইতিমধ্যে দেশে ফিরে আসা প্রবাসী শ্রমিকদের করোনা পরবর্তীকালে পুনরায় কর্মস্থলে প্রেরণের লক্ষ্যে বৈদেশিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদানুযায়ী নানামুখী কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের জন্য কারিগরি সহায়তা সরবরাহে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর আন্তরিক উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন। বিদেশ গমনেচ্ছুদের মধ্যে প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণ ও (নির্ধারিত পারিশ্রমিক, কর্মঘণ্টা উল্লেখপূর্বক) বৈদেশিক চাকরি সংক্রান্ত চুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য অভিবাসন সহায়তা ও পরামর্শ কেন্দ্র সহজলভ্যকরণের মাধ্যমে অভিবাসী শ্রমিকদের অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি ও হয়রানি লাঘব করা সহজ হবে, দাবি বিশেষজ্ঞদের। লিবিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী শ্রমিকেরা (বিশেষত নারী গৃহকর্মী) নিপীড়ন ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, এহেন দুর্ভোগ নিরসনে সংশ্লিষ্ট দেশে নিযুক্ত দূতাবাসকে তত্পর ভূমিকা গ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অভিবাসী আইনের আলোকে কর্মসংস্থানে সামগ্রিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ জরুরি।

বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির দায়িত্বহীনতা বা অবৈধ অভিবাসনের দরুন শ্রমিকেরা চুক্তিতে উল্লিখিত মজুরি, কর্মঘণ্টা ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত হওয়াসহ নানাবিধ হয়রানি ও প্রবাসে কারাবাসের মতো ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনা দূরীকরণে অবৈধ পন্থায় অভিবাসন ও মানব পাচার দমন, সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে তদারকির আওতাভুক্তি ও অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সে গড়ে উঠা স্তম্ভে মজবুত হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত। দেশের পক্ষ থেকে সকল প্রকার সুবিধা, নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা পাওয়া রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অধিকার ও প্রাণের দাবি। কর্মী গ্রহণকারী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অভিবাসন সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে দূরদর্শী সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রবাসী শ্রমিক কল্যাণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন বলে প্রত্যাশা দেশবাসীর।

n লেখক :শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ