রাশিয়ার তুন্দ্রায় রহস্যময় গর্তের কারণ উষ্ণায়ন!

রাশিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলের ওপর দিয়ে বিমানে যাওয়ার সময় সর্বপ্রথম রহস্যময় এক গর্তের সন্ধান পেয়েছিলেন এক টিভি রিপোর্টার। এরপর থেকে ঐ ধরনের আরো ৯টি গর্তের সন্ধান মিলেছে পৃথিবীর প্রান্ত হিসেবে পরিচিত রাশিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলে। একেকটা গর্ত ৭০ ফুট গভীর এবং ১০০ ফুট চওড়া। বিশালাকৃতির এসব গর্তের এই রহস্যভেদে গবেষকেরা বারবার সেখানে ছুটে গেছেন, কিন্তু সেই রহস্যের নিশ্চিত সমাধান এখনো কেউ দিতে পারেননি। কেউ মনে করেন, বিশালাকার উল্কা এই অংশে খসে পড়ার কারণে বিশাল এসব গর্ত তৈরি হয়েছে। কেউ আবার এটিকে ভিনগ্রহীদের যান নামার ফলাফল হিসেবেও উল্লেখ করেন। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, প্রাকৃতিক গ্যাস নির্গমনের ফলেও হতে পারে এই গর্ত। সর্বশেষ জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও মিথেন গ্যাস এবং পৃথিবীর উষ্ণায়ন বৃদ্ধি তত্ত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন গর্ত হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। তাদের যুক্তি, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্রিনহাউজ গ্যাস পরিবেশে বেড়ে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উষ্ণায়নের কারণে এই অঞ্চলে বিস্ফোরণ থেকে তৈরি হচ্ছে বিশাল আকৃতির এসব গর্ত। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, তার জন্য অধিকতর গবেষণার প্রয়োজন। এছাড়া আগস্ট মাসে এ ধরনের আরো একটি অভিযান করেছে ‘আরএএস ইনস্টিটিউট অব অয়েল অ্যান্ড গ্যাস               প্রবলেম’। তাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছে ইয়ামাল কর্তৃপক্ষ। রাশিয়ান সায়েন্টিফিক সেন্টার অব আর্কটিক রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. আন্দ্রে প্লেখানভ বলেন, গর্তের নির্মাণ সম্পর্কে ধারণা পেতে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তোলা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। হতে পারে এটি গত বছর বা দুই বছর আগে থেকে সৃষ্টি হচ্ছিল। আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এটা অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার কোনো প্রভাব। এটা অনেকটা ভূগর্ভস্থ বরফ অঞ্চলে কিছু একটা উদগীরণের মতো।

গর্ত চিহ্নিত স্থানে সবশেষ অভিযানটি ছিল ইয়ামাল কর্তৃপক্ষের আয়োজনে। তাদের সঙ্গে ছিলেন রাশিয়ার সেন্টার ফর স্টাডি অব দ্য আর্কটিক ও ক্রায়োস্ফেয়ার ইনস্টিটিউট অব দ্য অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের বিশেষজ্ঞরা। তারা গর্তের মাটি, পানি ও বাতাসের নমুনা সংগ্রহ করেন, যেখানে মিথেনের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে।

স্কোলকোভো ইনস্টিটিউট অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী এভজেনি চুভিলিন বলেন, রাশিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলের এই গর্তের রহস্য সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো গ্রহণযোগ্য একক তত্ত্বের ওপর নির্ভর করা যাচ্ছে না। তবে এটি নিশ্চিত, এ ধরনের গর্তগুলো অনেক বছর ধরে তৈরি হয়েছে।

তিনি মনে করেন, এখানে থাকা ‘পারমাফ্রস্ট’ ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস মিথেনের মজুত রয়েছে। এ ধরনের গ্রিনহাউজ গ্যাস সাধারণত গ্রীষ্মে বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। আর এ ধরনের বিস্ফোরণের ফলে এমন গর্ত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গর্তের ভেতরে অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া বিজ্ঞানীদের একজন ছিলেন এভজেনি চুভিলিন।

মিথেন গ্যাসের বিস্ফোরণের তত্ত্ব হিসেবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের বিস্ফোরণের আগে ভূগর্ভে দুই থেকে ছয় মিটার গভীর অঞ্চলে মিথেন জমাট বেঁধে থাকে। এক্ষেত্রে একেবারে নিচের দিক থেকে ওপরে উঠে আসা মিথেন এবং ওপর থেকে নিচের দিকেও নামতে থাকা মিথেন গিয়ে জমাট হতে থাকে ঐ অঞ্চলে। পরে গ্রীষ্মে যখন ঐ অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা বেড়ে যায়, তখন ঘটছে এসব বিস্ফোরণ।—সিএনএন