তাদের অভিযোগ, মানসম্পন্ন ক্লাস হচ্ছে না
আরফিন শরিয়ত
তোড়জোড় করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে অনলাইন ক্লাস শুরু করলেও ঈদের পর থেকে কমে এসেছে শিক্ষার্থী উপস্থিতির সংখ্যা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষকরা ‘মানসম্পন্ন’ ক্লাস না নিতে পারায় তারা ক্লাসে অংশগ্রহণ করছে না। এদিকে শিক্ষার্থীরা উপস্থিত না থাকায় শিক্ষকরাও পূর্বের মতো ক্লাস নিচ্ছেন না। এছাড়া শুরুর দিকে শিক্ষকদের গুগল ক্লাসে ‘রেকর্ডেড ভিডিও ক্লাস’ দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও এ কার্যক্রমে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। গত ৭ জুলাই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, আমাদের মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাখা। এটাকে আমরা স্বাভাবিক ক্লাসের বিকল্প হিসেবে ভাবিনি। শিক্ষার্থীদের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা এবং তারা যাতে ঝরে না পড়ে সেদিকে আমরা লক্ষ্য স্থির রেখেছি। শিক্ষার্থীদেরও বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ, প্রতিকূলতা, অসুবিধার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর মধ্য দিয়ে তাকে সামনে অগ্রসর হতে হবে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমকে আমরা গতিশীল করব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনলাইন ক্লাস শুরুর প্রথমদিকে ক্লাসে উপস্থিত শিক্ষার্থীর পরিমাণ ৪৫-৫০ শতাংশ থাকলেও পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তা কমে যায়। বিশেষ করে, ঈদুল আজহার পর এ সংখ্যা কমে গেছে দ্বিগুণ হারে। তবে এ পরিসংখ্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের একেক বিভাগে একেক রকম।
অনলাইন ক্লাসের শুরুর দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রতিটি বর্ষে ৫০-৫৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও চলতি সময়ে তা নেমে এসেছে ২০-২৫ জনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগের অবস্থা একইরকম। ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগে চারটি বর্ষেই শুরুতে কিছু অনলাইন ক্লাস হলেও ঈদের পর আর কোনো ক্লাস হয়নি। এ বিভাগে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ছিল ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ। তবে ক্লাস নিতে আগ্রহী না শিক্ষকরা। শিক্ষকরা বলছেন, কোর্স শেষ, কিন্তু পরীক্ষা না হওয়ায় সামনের সেমিস্টারে এগুতে পারছেন না তারা।
কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে ৮০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫০ থেকে ৫৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। তড়িত্ প্রকৌশল ও ইলেকট্রনিক বিভাগে ৮০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের চিত্র ভিন্নরকম। এ বিভাগে ৮০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭০-৭৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। প্রথমদিকে কিছুটা ধীরগতিতে চললেও এখন ভালোভাবেই ক্লাস চলছে বলে জানান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। আইন বিভাগে ১৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে শুরুর দিকে ৯০-১০০ জন অংশগ্রহণ করলেও এখন ৫০-৬৫ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৫টি বিভাগ ঘুরে পাওয়া যায় ভিন্ন ভিন্ন সব তথ্য। দেখা যায়, একেকটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী উপস্থিতি, চাহিদা ও কার্যক্রম ভিন্ন ভিন্ন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি সর্বজনীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এর মধ্য দিয়েই বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলোর তাদের নিজস্ব কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।
রেকর্ডেড ক্লাসে অনাগ্রহ: বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথম দিকেই শিক্ষকদের অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি রেকর্ডেড ক্লাস অনলাইনে আপলোড করার দিকনির্দেশনা দেন। কিন্তু শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শিক্ষকরা খুব বেশি আগ্রহ দেখাননি তাতে। শিক্ষকরা বলছেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট, কপিরাইট ইত্যাদির জন্য রেকর্ডেড ক্লাস নিচ্ছেন না তারা। তাছাড়া অনলাইনে ছাড়ার পর এসব রেকর্ডেড ক্লাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে এমন উদ্যোগ নিচ্ছেন না তারা।
সার্বিক বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অনলাইন ক্লাস একটি ভালো উদ্যোগ কিন্তু আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এর সঙ্গে অভ্যস্ত নয়, যার কারণে এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনলাইন ক্লাসকে কোনো সমাধান বলে মনে করেন না এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, আমাদেরকে প্রথমে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে হবে। না হলে এর থেকে উত্তরণের কোনো সুযোগ আমাদের নেই।