মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য টাইলসের টুকরা। তাকে পড়ে আছে ১০ জোড়া জুতা। সব জুতা পুড়ে গলে গেছে। থাই অ্যালুমিনিয়ামের স্লাইডের কাচ ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। সিলিং ফ্যানের পাখা বেঁকে গেছে। ২৬টি সিলিং ফ্যানের মধ্যে শুধু একটি অক্ষত আছে। দুই দেওয়ালে লাগানো ছয়টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) পুড়ে গলে গেছে। তবে একটি এসিও দেওয়াল থেকে ঝুলে বা খসে পড়েনি। মসজিদের প্রবেশ কক্ষের পিলারে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। রক্তের দাগ দেখে মনে হচ্ছে দুর্ঘটনার পর পিলার ধরে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করেছিলেন কেউ।
এমন ধ্বংসযজ্ঞ দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ইউনিয়নের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে। শুক্রবার রাতে এশার নামাজের শেষের দিকে এখানে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অর্ধশত মুসল্লি দগ্ধ হন। আহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে চিকিত্সাধীন অবস্থায় গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া অগ্নিদগ্ধ আরো ১৭ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়া গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে এই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে চারটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নিহতদের তালিকা :শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন গতকাল রাতে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে ১৮ জনের নাম জানা গেছে। এরা হলেন—তল্লা এলাকার দুই ভাই জোবায়ের (১৮) ও সাব্বির (২১), মসজিদের মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন (৪৫) ও তার ছেলে জোনায়েদ (১৬), কুদ্দুস ব্যাপারী (৭২), মোস্তফা কামাল (৩৪), জুয়েল (৭), গার্মেন্টস কর্মী রাশেদ (৩০), হুমায়ন কবির (৭২), জামাল আবেদিন (৪০), ইব্রাহিম বিশ্বাস (৪৩), কলেজছাত্র রিফাত (১৮), পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইনুদ্দিন (১২), জয়নাল (৩৮), গার্মেন্টস কর্মী নয়ন (২৭), কাঞ্চন হাওলাদার (৫০), মোটর ওয়ার্কশপের শ্রমিক রাসেল (৩৪) ও বাহাউদ্দীন (৫৫)। এর মধ্যে ১৬টি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
চার তদন্ত কমিটি গঠন
এ ঘটনা তদন্তে সরকারের পক্ষ থেকে চারটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালককে (অপারেশন্স) প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি, তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) আব্দুল ওহাব তালুকদারকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরী বেবীকে প্রধান করে তিন সদস্যের এবং ডিপিডিসির প্রধান প্রকৌশলী মজিবুর রহমানকে প্রধান করে আরো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলেন :সরেজমিনে দেখা গেছে, পশ্চিম তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে যাওয়ার রাস্তাটি ১৬ বছর ধরে হাঁটুপানিতে ডোবা। ঐ স্থানে প্রচণ্ড দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে। মসজিদের সামনের ড্রেনও পচা পানিতে ডুবে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই পচা পানি মসজিদের ভেতরে জমে যায়। এক সপ্তাহ আগে মসজিদের প্রবেশ কক্ষের মেঝের টাইলসের জোড়া দেওয়া স্থান থেকে বুদবুদ আকারে গ্যাস বের হতে দেখা গেছে। মুসল্লিরা ধারণা করছেন যে মসজিদের উত্তর দেওয়ালের বাইরে মাটির নিচে গ্যাস লাইন থেকে গ্যাস লিকেজ হয়ে মসজিদের মেঝে দিয়ে বের হচ্ছে।
ঘটনার সময় মসজিদের কাছে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা রহমত মিয়া বলেন, ‘এশার নামাজের জন্য মসজিদে ঢোকার আগে পরিচিত একজনের সঙ্গে কথা বলার সময় হঠাত্ সামনে বিদ্যুতের খুঁটিতে স্পার্কিং হতে দেখি। ঐ খুঁটি থেকে মসজিদের বিদ্যুতের লাইন নেওয়া হয়েছে। স্পার্কিংয়ের মিনিট খানেক পর মসজিদের ভেতর থেকে প্রচণ্ড শব্দ আসে। আগুনের কুণ্ডলী দেখতে পাই। শুনতে পাই মানুষের চিত্কার। বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও। মসজিদ থেকে যারা বের হয়ে আসছেন, তাদের সবারই পরনের কাপড় পুড়ে গেছে। গায়ে কালো পোড়া দাগ। আমি একজনকে ধরে রিকশায় তুলে দেই।’
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জমশের আলী ঝন্টু বলেন, ‘রাত পৌনে ৯টার দিকে বিকট শব্দ শুনে আমি ঘটনাস্থলের কাছে যাই। এ সময় দেখি মসজিদের ভিতর থেকে মুসল্লিরা বাঁচাও বাঁচাও বলে চিত্কার করতে করতে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। পরে তাদের নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে পাঠানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করি।’
মসজিদে নামাজ পড়তে আসা শাহ নিজাম বলেন, এসি যদি বিস্ফোরণ হতো তাহলে দেওয়াল ভেঙে যাওয়ার কথা। সেটা তো হয়নি। এখানে বিস্ফোরণের অন্য কোনো কাহিনি থাকতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা যা বলেন :ঘটনার পর পর নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আরেফিনের নেতৃত্বে একটি অগ্নিনির্বাপক টিম ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তিনি জানান, মসজিদের উত্তর পাশের দেওয়াল ঘেঁষে মাটির নিচে একটি গ্যাসলাইন রয়েছে। এই লাইনের গ্যাস লিকেজ হয়ে মসজিদের ভিতরে জমে যেতে পারে। মসজিদের ভিতরে এসি থাকার ফলেও গ্যাস জমে যায়। কোনো কারণে কেউ বিদ্যুতের সুইচ বা লাইন চালু করার সময় স্পার্কিং থেকে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। যে কারণে ভিতরে একসঙ্গে সব কয়টি এসিতে আগুন ধরে যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমরা নিশ্চিত মসজিদের নিচে অথবা খুব কাছে কোনো স্থানে গ্যাসের লাইন আছে। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের বিষয়টিও তদন্ত করছি। এ ঘটনার পেছনে কোনো নাশকতা আছে কি না—তাও খতিয়ে দেখব। আমরা সব বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত কাজ চালিয়ে যাব।
নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা প্রদান :শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আহতদের সব চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া নিহত প্রত্যেক পরিবারকে লাশ দাফনের জন্য ২০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। কী কারণে এ বিস্ফোরণ ঘটেছে—তা সরকারের বিভিন্ন সংস্থা পৃথকভাবে তদন্ত করছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত্ আইভী বলেন, মসজিদের সামনে পানিবন্দি রাস্তাটি সিটি করপোরেশনের নয়। এটি ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের অধীন। এর পরও রাস্তাটি সংস্কারের জন্য টেন্ডার দেওয়া হয়েছে। রাস্তাটি সংস্কার হলে এলাকাবাসীর কষ্ট লাঘব হবে।
লাশ দাফন :জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের লাশ দাফনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শনিবার বিকাল পর্যন্ত চারটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স তল্লা এলাকায় প্রবেশ করে। এ সময় স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। অনেকেই বুক চাপড়িয়ে চিত্কার করতে থাকে। নামাজ পড়তে গিয়ে মৃত্যু হওয়ায় নিহতদের এলাকাবাসী ‘শহিদ’ আখ্যা দেন। তল্লা এলাকার বাড়িতে বাড়িতে টানিয়ে দেওয়া হয়েছে কালো পতাকা। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাজদাইর ও গোদনাইল কবরস্থানে লাশ দাফনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।