নাসিম আলী ও হালিমুর রহমান শাহিন, স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) থেকে
বাণিজ্যসমৃৃদ্ধ দক্ষিণের একটি উপজেলার নাম স্বরূপকাঠি। ব্রিটিশ আমল থেকেই কাঠ ব্যবসার জন্য দেশ জুড়ে স্বরূপকাঠির পরিচিতি রয়েছে। বর্তমানে এখানে ছোট-বড় ২৫টি ডকইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে আধুনিক মানের নানা আকারের নৌযান। এসব ডকইয়ার্ডে শুধু জাহাজ নির্মাণই করা হয় না, মেরামতের কাজও হয়। উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকার তিন সহস্রাধিক শ্রমিক ডকইয়ার্ডে কাজ করছে।
নদী ও খালবেষ্টিত স্বরূপকাঠিতে একসময় ছিল বাহারি নৌকার সমাহার। কাঠের ব্যবসা, পেয়ারা, নার্সারির জন্যও খ্যাতি রয়েছে এ উপজেলার। এসব পণ্য পরিবহনে প্রাচীনকাল থেকে স্থানীয়রা কাঠের নৌকার ওপর নির্ভরশীল ছিল। যাত্রী চলাচলে ব্যবহূত হতো গয়না নামের এক ধরনের নৌকা। মালামাল পরিবহনে ব্যবহার হতো কাঠামি, বাছারী, পদি, হাইল ওয়ালা নৌকা ও বাওয়ালি নৌকা। আর হাটবাজারে যেতে ও বেড়ানোর কাজে পানসি, হাত বৈঠা, ডিঙ্গি, ডোঙ্গা, টাবুরেসহ বাহারি নামের নৌকার প্রচলন ছিল। ৮০ দশকের প্রথম দিকে কাঠের নৌকার পাশাপাশি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও মিনি কার্গোর ব্যবহার শুরু হয়। এ সময় ইঞ্জিনচালিত এ নৌযান স্টিল দিয়ে তৈরি ও মেরামতের জন্য গড়ে ওঠে ডকইয়ার্ড। সময়ের ব্যবধানে এসব ডকইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন আকারের জাহাজও।
উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের পঞ্চবেকি গ্রামের জয়নাল আবেদিন (জয়নাল মহাজন) নিজ গ্রামে সর্ব প্রথম ডকইয়ার্ড গড়ে তোলেন। বর্তমানে উপজেলার সন্ধ্যা নদীর তীরসহ স্বরূপকাঠি, কালীবাড়ি, বরছাকাঠি, বালিহারী, পঞ্চবেকী, তারাবুনিয়া, মাগুরা, নাওয়ারা খালের তীরে গড়ে উঠেছে ডকইয়ার্ড। ঐসব ডকইয়ার্ডে এক টন ধারণক্ষমতার ছোট মাপের ট্রলার থেকে শুরু করে ২ হাজার টন ধারণক্ষমতার বিশাল জাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। ফরাজী অ্যান্ড মোল্লা ডকইয়ার্ডে নির্মাণ ঠিকাদার মো. সাইদুল ইসলাম জানান, ১ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি জাহাজ তৈরি করতে পাঁচ-ছয় মাস সময় লাগে। সব খরচ বাদে এতে তার দেড় থেকে ২ লাখ টাকা আয় হয়। তিনি আরো জানান, এখানে ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যের সার্ভিস লঞ্চ, কোস্টার, বাল্কহেড নির্মাণ করা সম্ভব।
এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তারা ইত্তেফাককে জানান, জাহাজ-কার্গো নির্মাণের কাঁচামাল আনা হয় চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী, কুমিরা সীতাকুণ্ড ও ঢাকার পোস্তগোলা থেকে। নির্মাণসামগ্রীর কাঁচামালের ৮৫-৯০ ভাগ ভেঙে ফেলা জাহাজ থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাকি ১০-১৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জাহাজ মালিক জানান, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ বড় সাইজের কোস্টার, কার্গো, মালবাহী জাহাজ নির্মাণে প্লান অনুমোদন বন্ধ রাখার কারণে অনেক শিল্প উদ্যোক্তা জাহাজ নির্মাণ করতে পারছেন না। ডকইয়ার্ড মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. তৌফিকুল ইসলাম তপু জানান, ডকইয়ার্ড শিল্প মানুষের কর্মসংস্থানের একটি নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সম্ভাবনাময় এ শিল্প অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। খুলে যেতে পারে উন্নয়নের নতুন দ্বার।
তিনি আরো বলেন, উপজেলার সন্ধ্যা নদীর তীরে সরকারিভাবে ভূমি বন্দোবস্ত পেলে এ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মোশারেফ হোসেন বলেন, ডকইয়ার্ডে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এখানকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। এখানকার জাহাজ নির্মাণ শিল্প দিন দিন সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হচ্ছে।