গত কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন হাজার মণ এবং গতকাল রবিবার দেড় হাজার মণ ইলিশ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বরিশালের ব্যবসায়ীরা। সাগরে জেলেদের জালে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ায় দাদনদার, আড়তদাররা চাহিদার বেশি ইলিশ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। স্থানীয় বাজারগুলোতে ইলিশের দাম কম থাকলেও ক্রেতার অভাব লক্ষ করা গেছে। ফলে দাদনদার ও আড়তদাররা লোকসানের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। বরিশালের বৃহত্ মত্স্য অবতরণ কেন্দ্রের (পোর্ট রোডের মোকাম) মত্স্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নীরব হোসেন টুটুল জানান, সরকারের কঠোর অভিযান ও প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞার ফলে ইলিশের উত্পাদন বাড়ছে। চাহিদার চাইতে বেশি ইলিশ মোকামে আসতে শুরু করায় দাম কমে গেলেও ক্রেতা মিলছে কম। করোনার প্রেক্ষাপটে সাধারণ ক্রেতারা নিয়মিত বাজারে আসছেন না। তাই ইলিশ নিয়ে তারা বিপাকে পড়েছেন। তিনি সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, কয়েক জন মিলে ইলিশ রপ্তানি করলেও সাধারণ ব্যবসায়ীরা তা করতে পারছে না। তাই অবিলম্বে সব ব্যবসায়ীকে ইলিশ রপ্তানির নির্দেশনা না দিলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হবে। কেননা জেলেদের দাদনের টাকা দেওয়ায় তারা ইলিশ পৌঁছে দিয়ে ফের সাগরে চলে যাচ্ছে। বিপুল পরিমাণ মাছ নিয়ে দাদনদার ও আড়তদাররা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন তা সংরক্ষণের জন্য। সাগরপাড়ের মহিপুর আড়তদার সমিতির সভাপতি ফজলু গাজী জানান, প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার মণ ইলিশ মিললেও পর্যাপ্ত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই রপ্তানি ছাড়া ক্ষতি পোষানো সম্ভব নয়। একাধিক আড়তদার জানান, ২০১২ সাল থেকে সরকার ইলিশ রপ্তানি বন্ধ করলেও চোরাই পথে ইলিশ পাচার হচ্ছে। এতে করে পাচারকারীরা লাভবান হলেও ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। তারা জানান, সাগরের ইলিশ বেশি দিন সংরক্ষণ করে রাখা যায় না। একাধিক আড়তদার জানান, সাগরে ইলিশ মেলায় বরফকলগুলোতে দিন-রাত সমানতালে বরফ উত্পন্ন করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
মত্স্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আনিচুর রহমান ইত্তেফাককে জানান, সাগরপাড়ের মহিপুর, আলিপুর ও বরিশালের মোকাম মিলে প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ হাজার মণ ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। গত মৌসুমে বরিশাল থেকে ২ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিকটন ইলিশ পাওয়া গেলেও চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিকটন ইলিশ পাওয়া গেছে। এবারে বড় সাইজের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে যা সরকারের বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞার সুফল। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। ইলিশ রপ্তানি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ব্যবসায়ীরা ইলিশ রপ্তানির দাবি জানিয়ে আসছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের অবহিত করা হয়েছে।
বরিশালের বৃহত্ মত্স্য অবতরণ কেন্দ্রের (পোর্ট রোডের মোকাম) আড়তদার সমিতির প্রচার সম্পাদক ইয়ার উদ্দিন সিকদার জানান, বর্তমানে সাগরে যে ইলিশ মিলছে তার অধিকাংশই বড় সাইজের। সাগর থেকে বোটবোঝাই ইলিশ নিয়ে ফেরা মনির মাঝি ইত্তেফাককে জানান, প্রত্যেকটি বোটে ২০ থেকে ২৫ মণ ইলিশ বোঝাই করে তারা মোকামে ফিরছেন। গতকাল সাগরের ৬০০ থেকে ৯০০ গ্রাম সাইজের প্রতি মণ ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২০ হাজার টাকায়। এছাড়াও ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি মণ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাগরের নোনা পানির ইলিশের দাম কম হওয়ায় অনেকেই কিনতে পারছেন। গতকাল রবিবার পোর্ট রোডের মোকামে সরেজিমেন গিয়ে দেখা গেছে, দাম কম হওয়ায় চার-পাঁচ জন মিলে একমণ দেড় মণ করে মাছ কিনে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। আবার খুচরা দুই-চার কেজি যারা ক্রয় করে থাকেন তারাও প্রয়োজনমতো ইলিশ ক্রয় করছেন।
নগরীর পলাশপুর এলাকার খাইরুল ইসলাম জানান, তিনি ৫০০ গ্রাম ওজনের এক হালি ইলিশ হাজার টাকায় ক্রয় করেছেন। নদীর ইলিশ হলে ১ হাজার ৫০০ টাকায়ও তিনি এ মাছ কিনতে পারতেন না। তিনি জানান, ‘সাগরের ইলিশ হলেও ইলিশ তো’। একই মতামত পোর্ট রোডের এ বৃহত্পাইকারি বাজারে ইলিশ কিনতে আসা ক্রেতাদের। একাধিক ক্রেতা জানান, তারা ইলিশ মিলছে সংবাদ পেয়ে ক্রয় করতে এসেছেন। তারা জানান, মৌসুমে এই প্রথম ইলিশ কিনছেন। দাম কম হওয়ায় একটু বেশি পরিমাণে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা জানান, সাগরের এ ইলিশ কিনতে স্বল্প আয়ের ক্রেতারাই বেশি ঝুঁকছেন। বড় সাইজের ইলিশেরও দাম কমে যাওয়ায় নগরী ও আশপাশের এলাকা থেকে স্বল্প আয়ের ক্রেতারা এসে বেশি পরিমাণ ইলিশ কিনে নিচ্ছেন।