সংসদে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ ও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। গতকাল সোমবার সংসদে আইন প্রণয়ন কার্যক্রম শেষে পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর দিয়ে তারা দুই জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তোলেন। কিন্তু তাদের সমালোচনার জবাব সরকারি দলের কেউ দেননি। দিয়েছেন প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) এমপি পীর ফজলুর রহমান।
বিএনপির হারুন বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে মানুষকে উঠিয়ে নিয়ে গুলি করে হত্যার পর নাটক সাজানো হচ্ছে। আর সরকার সেগুলোর সার্টিফিকেট দিচ্ছে। একই দলের রুমিন ফারহানা বলেন, দেশে প্রতিদিনই একটির বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যা হয়। অথচ বারবারই বলা হচ্ছে এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আসলে একটিও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাষ্ট্রটি একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
বিএনপির এই দুই এমপির বক্তব্যের পর আইনজীবীদের এনরোলমেন্ট পরীক্ষার প্রসঙ্গে বলার জন্য পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নেন জাপার পীর ফজলুর। বক্তব্যে প্রথমে তিনি বিএনপির হারুন ও রুমিনের বক্তব্যের জবাবে বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায় কেউই এড়াতে পারেন না। বিএনপি সরকারের আমলে ক্লিনহার্ট অপারেশনের নামে অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে বিচারবহির্ভূতভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। অনেকে সেই নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। মিথ্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।
হারুন বলেন, আজ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বিষয়ে যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে গত ১০-১২ বছরে ৩ হাজারের বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আজ যারা স্বজনকে হারিয়েছেন, গুম হয়েছেন বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তারা কি আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার পাবে না? সংবিধানের এই বিধানগুলো কি আমরা স্থগিত করে দিয়েছি? সব মানুষ আইনের আশ্রয় লাভের সমান সুযোগ পাবেন কি-না, তা জানতে তিনি সংসদে ৩০০ বিধিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করেন।
নিজের নির্বাচনি এলাকার তিনটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ দিয়ে বিএনপির এই এমপি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর বলা হয় পুলিশের ওপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ! এটা কি সম্ভব! পুলিশের কাছে যে অস্ত্র থাকে তা মোকাবিলার জন্য সন্ত্রাসীদের কাছে যে অস্ত্র দরকার...এখানে উদ্ধার দেখানো হয় হাতে তৈরি বাটাল, পিস্তল। হারুন আরো বলেন, আমরা আজ মহাসংকটে আছি। একদিকে করোনা মহামারি, অপরদিকে বন্যায় মানুষ বিপর্যস্ত। প্রবাস থেকে লাখ লাখ মানুষ নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন। দেশের অর্থনীতি চরম চাপের মধ্যে রয়েছে।
২০০৩ সালে প্রণীত ‘হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ’ আইনের প্রসঙ্গ টেনে রুমিন ফারহানা বলেন, এই আইনটিতে চমত্কার সব ধারা থাকা সত্ত্বেও দুঃখজনক হলেও সত্য এই আইনের আওতায় খুব বেশি মামলা হয়নি। মেজর (অব.) সিনহা হত্যাকাণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, অতিসম্প্রতি একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সবার দৃষ্টি কেড়েছে। টেকনাফে কুখ্যাত ওসি প্রদীপ ২০১৯ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বিপিএম পেয়েছেন। এই পদক দেওয়ার ক্ষেত্রে যে ছয়টি ঘটনার উল্লেখ করা হয়, তার প্রত্যেকটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। কেবল পদক নয়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পেছনে অর্থ লেনদেনের বিষয়ও জড়িত রয়েছে। অথচ মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে গুম বলে কিছু নেই। পুলিশের আইজি বলেন, ক্রসফায়ার বলে কিছু নেই। এগুলো নাকি এনজিওগুলোর দেওয়া শব্দ। তিনি বলেন, যেই রাষ্ট্রে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বিভিন্নভাবে উত্সাহ দেওয়া হয়, সেখানে বিচারবিভাগ ধ্বংস হয়েছে। আইনের শাসন ধ্বংস হয়েছে। মানুষ বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়েছে।
এরপর জাপার পীর ফজলুর রহমান বলেন, আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে সবাই। এখানে ওসি প্রদীপের কথা বলা হয়েছে। প্রদীপের প্রথম পদোন্নতি হয় বিএনপির আমলে। মিথ্যা মামলায় আসামি করা আমরা আগেও দেখেছি। ময়মনসিংহে সিনেমা হলে বোমা বিস্ফোরণ মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরী ও অধ্যক্ষ মতিউর রহমানকে আসামি করা হয়েছিল। আমরা তখনো এর বিরুদ্ধে ছিলাম। এখনো এর বিরুদ্ধে। পরে তিনি করোনাকালে বার কাউন্সিল পরীক্ষা নিয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকি না বাড়িয়ে জেলা জজের অধীনে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে আইনজীবী এনরোলমেন্টের ব্যবস্থা করার দাবি করেন।
এর আগে তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী পয়েন্ট অব অর্ডারে দারুল আরকাম মাদ্রাসার শিক্ষক কর্মকর্তারা আট মাস বেতন পাচ্ছেন না, তাদের বিষয়টি বিহিত ব্যবস্থার দাবি করেন।