ড. মো. রওশন আলম
ভ্যাকসিন ডেভেলপমেন্টের ফাইনাল দৌড়ে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিগুলো কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? ফাইনাল দৌড় বলতে বোঝাতে চাইছি ফেজ-৩ কিংবা ফেজ-২ বা ৩ ট্রায়ালের হালচাল। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ কিংবা অক্টোবর যত ঘনিয়ে আসছে, সায়েন্টিফিক কমিউনিটিতে একটি প্রশ্ন অনেকের মনেই ইদানীং ঘুরপাক খাচ্ছে। তা হচ্ছে, কোন ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি সবচেয়ে আগে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে একটি নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন মার্কেটে নিয়ে আসতে পারবে? সেটি কি এস্ত্রাজেনিকা? নাকি মডার্না? নাকি ফাইজার বা বায়োনটেক? নাকি অন্য কেউ?
তবে এটা আমাদের জানা থাকা ভালো যে ইতিমধ্যে অন্তত ৩১টি এক্সপেরিমেন্টাল ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্টের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে, যাদের মধ্যে নির্দিষ্ট ছয়টি ক্যান্ডিডেট ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল স্টেজে আছে। সেই ছয়টি ক্যান্ডিডেট নিয়ে যে ফার্মাগুলো কাজ করছে, তাদের মধ্যেও চলছে তুমুল কম্পিটিশন। কোন ফার্মা কার্যকর ও নিরাপদ ভ্যাকসিন ডেভেলপমেন্টের ফিনিশ লাইনগুলো সবার আগে ক্রস করতে পারবে—সেই কম্পিটিশন থাকা অমূলক নয়। কারণ ভ্যাকসিনের পজিটিভ রেজাল্টের সঙ্গে ফার্মার শেয়ার ভ্যালুর (স্টক) একটি ওতপ্রোত সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে, যা রাতারাতি বেড়ে যায়। ফলে কোম্পানির ক্যাপিটালও বেড়ে যায়।
লক্ষ্য শুধু তাই নয়, একটি সফল ভ্যাকসিনের সাপ্লাই অ্যান্ড ডিমান্ডের ব্যাপারটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি নির্দিষ্ট ফার্মা যদি সফল ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেও ফেলে, সে ক্ষেত্রে কি তারা সাড়া পৃথিবীর চাহিদা এককভাবে মেটাতে সক্ষম? উত্তর না। কারণ প্রোডাকশন বা উত্পাদন ক্যাপাসিটি। সাপ্লাই অ্যান্ড ডিমান্ড। তদুপরি ভাইরাস রোগটি দমনের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি নামক একটি টার্ম চালু আছে। সাড়া পৃথিবী থেকে করোনা ভাইরাস নির্মূলের ক্ষেত্রে লং টার্ম হার্ড ইমিউনিটি অনিবার্য। এক্সপার্টরা বলছেন যে করোনা ভাইরাসের অ্যাবসিলিউট হার্ড ইমিউনিটিতে পৌঁছাতে হলে টোটাল জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ মানুষকে করোনা ভাইরাস ইমিউন হতে হবে। সেক্ষেত্রে পৃথিবীর টোটাল ৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন মানুষকে ভ্যাকসিন নিতেই হবে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে এত বিপুলসংখ্যক ডোজ দ্রুত উত্পাদন করা কোনো একক ফার্মার পক্ষে সম্ভব নয়, বরং দুঃসাধ্য ব্যাপার।
এবার দেখা যাক ভ্যাকসিন সাপ্লাইয়ের ক্ষেত্রে কোন ফার্মার কতটুকু ক্যাপাসিটি বা সক্ষমতা রয়েছে। অন্তত যারা করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন নির্ণয়ের দৌড়ে লিডার ফার্মা বলে পরিচিত, বিশেষ করে যাদের এক্সপেরিমেন্টাল ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট ফেজ-৩ বা ফেজ-২-৩ ট্রায়ালে আছে। যেমন মডার্না থেরাপিউটিকস (এমআরএনএ ভ্যাকসিন) বছরে কেবল ৫০০ মিলিয়ন ডোজ উত্পাদন করতে সক্ষম। তবে তাদের এই সক্ষমতা আগামী বছর (২০২১) নাগাদ এক বিলিয়ন ডোজ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ড্রাগমেকার এস্ত্রাজেনিকা, যারা ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের সঙ্গে জয়েন্টলি ভ্যাকসিন ডেভেলপ করছে, তাদের উত্পাদন ক্যাপাসিটি হচ্ছে বছরে সর্বাধিক ৩ বিলিয়ন ডোজ। আন্তর্জাতিক আরেক জায়ান্ট ফার্মা ফাইজার এবং তার পার্টনার জার্মানির বায়োনটেক ঠিক মডার্নার মতোই এমআরএনএ ভ্যাকসিন উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণা করছে এবং তাদের ক্যান্ডিডেটটি ফেজ-৩-এ অগ্রসরমান। বায়োনটেক বা ফাইজারের উত্পাদন ক্যাপাসিটি ২০২১ সালের শেষ নাগাদ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডোজ পর্যন্ত পৌঁছাবে।
আমেরিকা মডার্নাকে অগ্রিম অর্থ দিয়ে রেখেছে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। তার বিনিময়ে তারা ১০০ মিলিয়ন ডোজ পাবে মডার্নার কাছ থেকে। এস্ত্রাজেনিকার কাছ থেকে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ৩০০ মিলিয়ন ডোজ পাবে। একইভাবে ফাইজার বা বায়োনটেকের কাছ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডোজ ইউএস পাবে ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে। আমেরিকার পাশাপাশি কতিপয় ইউরোপের দেশ এবং ইংল্যান্ডও এই ভ্যাকসিন ফার্মাগুলোর সঙ্গে অগ্রিম চুক্তিবদ্ধ হয়েছে, যাতে তারাও সময়মতো ভ্যাকসিনের ডোজগুলো হাতে পায়। এই অগ্রিম অর্থ দেওয়া এটা নিশ্চয়তা দেয় না যে ফেজ-৩-এ সব ভ্যাকসিনই উতরাতে পারবে। মাথায় রাখতেই হবে, যে কোনো ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট ফেজ-৩-এ ফেল মারতেই পারে।
হার্ড ইমিউনিটি ও ওয়ার্ল্ডের টোটাল পপুলেশনের কথা বিবেচনা করলে একাধিক সফল ভ্যাকসিনের প্রয়োজন। মডার্না, এস্ত্রাজেনিকা, ফাইজার বা বায়োনটেক ফেজ-৩-এ এবং ফিনিশ লাইনের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। তারা সবাই সাকসেসফুল হলেও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অন্য কোম্পানিগুলো যে ভ্যাকসিনগুলো ডেভেলপ করছে, যারা খানিকটা পিছিয়ে আছে ক্লিনিক্যাল ফেজে, তাদের চাহিদাও শেষ হয়ে যাবে না। আমরা একাধিক সফল ভ্যাকসিনের মার্কেটে আসার অপেক্ষায় থাকব। বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রম সফল হোক। করোনামুক্ত হ্যাপি পৃথিবীর অপেক্ষায়...।
n লেখক :বোস্টনের ফার্মাসিউটিক্যাল
ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত।