মানুষের হাত দিয়েই বদলে যাক পৃথিবী

একটা হাত। কী আর এমন। শরীরের অংশমাত্র। শরীর ব্যবচ্ছেদ করলে রক্ত-মাংসহীন কিছু হাড়ের সমষ্টিমাত্র।  হয়তো সেটা সাধারণ মানুষের চোখে। ভিন্নমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা হাত ভয়ংকর দৈত্যের মতো মহাশক্তিধর  হয়ে উঠতে পারে। আবার একটা হাত মানুষের স্বপ্ন, আশা, আনন্দ ও ভালোবাসার রসে সিক্ত হতে পারে। হাত ভয়ংকর কিংবা ত্যাগী হয়। হাত কখনো দৃশ্যমান, কখনো অদৃশমান হয়। হাত কখনো সত্ হয়, কখনো দুর্নীতিবাজ হয়। হাত কখনো খুনি হয়, কখনো ভালোবাসার হয়। হাত কখনো সত্য হয়, কখনো মিথ্যা হয়।  হাত কখনো সাদা হয়, কখনো কালো হয়। হাত কখনো কখনো বিশ্বাসঘাতক ও আত্মঘাতীও হয়! হাত অনেক কিছুই হতে পারে। অনেকটা রূপক, অনেকটা বাস্তব। হাত লম্বা হতে হতে কোথায় গিয়ে পৌঁছায়, মানুষ তা কখনো বুঝতে পারে, কখনো বুঝতে পারে না। কখনো বুঝতে পারলেও বোঝে না। দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান হাত অনেক সময় ইতিবাচক হয়ে ওঠে। মানুষের হাত যত ইতিবাচক হবে, পৃথিবী ততই এগিয়ে যাবে। মানুষের হাত ধরেই মানুষের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার দিকে যাত্রা শুরু হয়। বাবার হাত মায়ের হাত, শিক্ষকের হাত, স্বপ্ন দেখানো মানুষের হাত। বিশ্বাস ও ভরসার হাত। ভালোবাসা আর কল্যাণের হাত। শুভবোধের হাত, শুভচিন্তার হাত। এমন অনেক ইতিবাচক হাত মানুষকে মানুষ হিসেবে তিলে তিলে গড়ে তোলে। মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করে। মানুষকে সমৃদ্ধ করে। মানুষের সুপ্ত চিন্তার বিকাশ ঘটায়। জীবনকে নন্দিত করার মতো একটা কথা প্রায় শোনা যায়, কথাটা অনেকটা এমন—ভালোবাসার মানুষের হাত কখনো ছেড়ে দিও না। কারণ অনেক হাতই পাওয়া যায়, কিন্তু ভালোবাসার হাতটা আর পাওয়া যায় না, যা তোমাকে অনেক বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছে, তোমাকে ক্লান্ত হলে আদর করে ঘাম মুছে দিয়েছে, তাকে হারিয়ে যেতে দিও না। মায়ের আবেগ, ভালোবাসা আর কষ্টের হাত। একসময় অদৃশ্যমান থাকে। মাতৃগর্ভে সন্তান। নিজের জীবনের চেয়েও বড় যে সন্তান, স্বপ্নের চেয়েও বড় সেই সন্তান। মা তখনো হাত দিয়ে সন্তানকে ধরেননি, কিন্তু মায়ের অদৃশ্য মনের হাত দিয়ে মাতৃগর্ভে সন্তান দিনের পর দিন বড় হয়ে উঠেছে। মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে এসে সন্তান পৃথিবীর মুখ দেখেছে। মায়ের বিস্ময়কর হাতের জাদুকরী আবেগে সন্তান ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। সন্তানকে বড় করতে মমতাময়ী মায়ের অদৃশ্য হাত আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছেছে। সন্তানকে এক পা, দুপা করে হাঁটতে থাকা মায়ের হাত মনের আনন্দে কেঁদেছে। কেউ তা দেখেনি। মায়ের মনও দেখেনি, আবেগও দেখেনি। সন্তান যাতে হাঁটতে গিয়ে পড়ে না যায়, সেটি মায়ের হাত দেখেছে। এর প্রতিদান হয়তো মা একদিন নেতিবাচকভাবে পেয়েছেন। যে মায়ের হাত সন্তানকে আগলে রেখেছিল। সেই মায়ের হাত সময়ের বিবর্ণতায় নিষ্ক্রিয় হয়েছে। সন্তানের হাত ক্রমাগত সক্রিয়ও হয়েছে। একদিন সন্তানের হাত ধরে চোখ মুছতে মুছতে মাকে নির্বাসিত হতে হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। এ প্রসঙ্গে নচিকেতার গানটা খুব মনে পড়ে যায় :

‘নিজ হাতে ভাত খেতে পারত না কো খোকা

বলতাম, আমি না থাকলে রে কী করবি বোকা?

ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদত খোকা আমার কথা শুনে

খোকা বোধহয় আর কাঁদে না, নেই বুঝি আর মনে

ছোট্টবেলায় স্বপ্ন দেখে উঠত খোকা কেঁদে

দু’হাত দিয়ে বুকের কাছে রেখে দিতাম বেঁধে

দু’হাত আজো খোঁজে, ভুলে যায় যে একদম

আমার ঠিকানা এখন বৃদ্ধাশ্রম’

ইতিবাচক হাত এভাবেই কখন নেতিবাচক হাত তৈরি করে দেয়, তা কেউ বুঝতে পারে আবার কেউ বুঝতে পারে না। কেন এমনটা ঘটে? সময় কেন মানুষকে বদলে দেয়? নিঃস্বার্থের হাত দিয়ে বড় হয়ে ওঠা হাত কেন স্বার্থপর হয়ে ওঠে সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। মনস্তত্ত্ববিদদের গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে ইতিবাচক হাত থেকে ইতিবাচক হাতের জন্মের সমাধান বের করে আনতে হবে।

বাবার হাত। মায়ের থেকে শক্ত, একটু কঠিন। মায়ের ভালোবাসার হাত দেখা যায়, বাবার ভালোবাসার হাত কখনো কি দেখা যায়? হয়তো যায় কিংবা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। যে হাত সন্তানের ভবিষ্যতের ভাবনায় সারা পৃথিবীর সঙ্গে লড়ে যায়। অনেকটা নিভৃতে, নীরবে, নিঃশব্দে। শরীরের পরতে পরতে ঘাম, ক্লান্তি; কিন্তু বাবার স্বপ্নের হাত থেমে থাকে না, কাজ করে যায় অবিরত। বাবা স্বপ্ন দেখে তার সন্তান একদিন বড় হবে, তার হাত ধরবে। সংসারের হাল শক্ত হাতে ধরবে। সেই স্বপ্ন দেখা হাত কি কখনো মানুষের হাত হয়ে ওঠে? কে জানে, কেইবা বলতে পারে! তার পরও বাবার নিঃস্বার্থ হাত সন্তানের বিশ্বাস, স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যায়।

শিক্ষকের হাত, মা-বাবা থেকে ভিন্ন একটা হাত। কিন্তু তার পরও কোথায় যেন হাত ধরে শিক্ষার্থীকে ওপরে তোলার অবিরাম চেষ্টা। শিক্ষকের হাত ধরেই শিক্ষার্থীরা জ্ঞানের সন্ধান পায়। শিক্ষকের হাত ধরেই শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হয়। শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্ন শিক্ষকের হাত ধরেই গড়ে ওঠে। অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ‘কল্পনা জ্ঞানের চেয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ।’ শিক্ষার্থীর মধ্যে কল্পনাশক্তি তৈরির সক্ষমতা গড়ে দেন শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষকের সেই ইতিবাচক ও বিশুদ্ধ হাত কি এখনো আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি? বিশ্বায়নের নামে শিক্ষকের বিকশিত হাত আজ মুষ্টিবদ্ধ জড়তায় কেমন যেন বদলে গেছে। কেউ কেউ হয়তো এখন অদৃশ্য হাত দিয়ে স্বপ্ন দেখান, কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষকই তা আর দেখাতে পারছেন না। কেন এমনটা হলো? ভাবতে হবে। গবেষণা করে সমস্যার সমাধান বের করে আনতে হবে। তা না হলে আগামী প্রজন্ম মনুষত্বহীন জড় পদার্থে পরিণত হবে। তবে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন খুব নির্মম এক সত্য কথা বলেছেন। তা হলো, “যারা আমাকে সাহায্য করতে না করে দিয়েছিল, আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ তাদের ‘না’-এর জন্যই আজ আমি নিজের কাজ নিজে করতে শিখেছি।” সব হাত যখন মানুষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখনো নিজের আত্মশক্তির হাত শক্ত করতে হয়, নিজেকে চেনার শিক্ষাটা নিজ হাতেই তুলে নিতে হয়।

n লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর