সম্প্রতি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের লাগামহীন দৌরাত্ম্য। রাস্তাঘাট, পাড়া, মহল্লা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কিশোর গ্যাং নামের উঠতি বয়সি তরুণরা। ভয়ংকর কিশোর গ্যাং এখন পেশাদার সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়েছে। চাঁদাবাজি, ভূমি দখলদারিত্ব, হুমকি, মারামারি, ভাড়াটিয়া খুনি ও পথেঘাটে মেয়েদের উত্ত্যক্তসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে তারা। পকেটে নগদ টাকা, হাতে অস্ত্র ও মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে বুনো উল্লাসের সঙ্গে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে তারা। সম্প্রতি এমনই দুটি ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে ও সাভারে। কামরাঙ্গীরচরের ১৫-১৬ জনের কিশোর গ্যাং সদস্যদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয় স্থানীয় সজিব নামের ১৭ বছর বয়সি কিশোর। অপর দিকে, সাভারের জাহাঙ্গীরনগর স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিব এলাকার কিশোর গ্যাং সদস্যদের মাদক বিক্রিতে বাধা প্রদান করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে রাকিব গত শুক্রবার প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফেরার সময় ১০-১২ জনের কিশোর গ্যাং হাতুড়ি দিয়ে তার কোমরের হাড় মারাত্মকভাবে ভেঙে দেয়। ফলে অতিষ্ঠ ও আতঙ্কিত এলাকাবাসী, ব্যাহত হচ্ছে বসবাস করার সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশ।
কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার মূল কারণ নেপথ্যে থাকা এলাকার কিছু নেতা ও প্রভাবশালী বড় ভাই। ব্যক্তিগত স্বার্থে টাকার বিনিময়ে নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিরা কিশোর গ্যাংদের দিয়ে বিভিন্ন অসামাজিক ও বেআইনি কর্মকাণ্ড করাচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারাও এদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ফলে এক দিকে যেমন নেতা ও প্রভাবশালী বড় ভাইদের স্বার্থ হাসিল হচ্ছে অপর দিকে কিশোর গ্যাং সদস্যদের এলাকায় আলাদা একটা প্রভাব বিস্তার লাভ করছে। এছাড়াও এলাকায় নিজ নিজ প্রভাব বিস্তার নিয়েও গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, রাজধানী ঢাকা শহরেই রয়েছে ৫০টি কিশোর গ্যাং। এছাড়াও বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতেও দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে কিশোর গ্যাং।
কিশোর গ্যাং দৌরাত্ম্যের লাগাম যেভাবে বাড়তে শুরু করেছে তাতে এখনই মুখ্য সময় এ লাগাম টেনে ধরার। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখতে হবে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য গ্রেফতারের পর বিচার না করে বরং দু-চার দিনের মাথায় তারা ছাড়া পেয়ে যায়। আর এ বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে তারা পূর্বের চেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে, বেড়ে যায় অপরাধপ্রবণতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ স্থবিরতা কাটিয়ে আরো কঠোর হতে হবে। প্রতিটি এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে কিশোর গ্যাং সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংদের নেপথ্যে কাজ করা রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রভাবশালী বড় ভাইদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগে যেন বাধা-বিপত্তি না আসে সেদিকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ, সরকারের সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। কিশোরদের মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধ গঠনে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে শিশু পরিচর্চা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সংগঠন ও সচেতন তরুণ সমাজকে কিশোর গ্যাং নিষ্পত্তিকরণে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি, আপনার সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে উঠাবসা করছে, চলাফেরা করছে সেদিকে অভিভাবকদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।