মধ্যবিত্তের অতৃপ্তি ও দুর্গতি

স্বাধীনতা লাভের পর গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনীতির নানা খাতে ও সূচকে উন্নতি লাভ করিয়াছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই ছোঁয়ায় দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও বিকাশ হইয়াছে। তাহাদের বিশাল অংশ চাকুরিজীবী, ফ্ল্যাট বা জমির মালিক এবং ব্যাংক-বিমা ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকারী। সাধারণত যাহারা দৈনিক দুই হইতে তিন ডলার (পিপিপি হিসাবে) আয় করেন, আন্তর্জাতিকভাবে তাহারা মধ্যবিত্ত হিসাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ২০ শতাংশ  জনগোষ্ঠী এখন মধ্যবিত্ত, যাহার সংখ্যা সাড়ে ৩ কোটিরও অধিক।

প্রকৃতপক্ষে নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থানের পর হইতেই বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ত্বরান্বিত হইয়াছে। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৯ শতাংশ ছিল মধ্যবিত্ত। দুই দশক পরে তাহা দ্বিগুণ হইয়াছে। এই মধ্যবিত্তের বিকাশ টেকসই প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য সহায়ক। মধ্যবিত্তের মূল্যবোধগুলোও বিবেচনায় আনা উচিত। সিম্পল লিভিং, হাই থিংকিং তথা সাধারণ জীবনযাপন ও উন্নত চিন্তাভাবনা হইতেছে মধ্যবিত্তের জীবনের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি বর্তমানে চরম হতাশায় নিমজ্জিত। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব তাহাদের এই হতাশাকে কয়েক গুণ বাড়াইয়া দিয়াছে। অনেকে জীবনের হিসাব আর মিলাইতে পারিতেছেন না। অবশ্য এই হতাশা শুধু বাংলাদেশের নহে, বিশ্বব্যাপী। বিশ্বের ৩৬টি ধনী দেশের সংগঠন অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনার কারণে বৈশ্বিক পরিসরে মধ্যবিত্তের উপার্জন থমকাইয়া গিয়াছে। অতিধনীদের সম্পদ বাড়িবার কারণেও তাহারা পড়িয়াছে চাপের মধ্যে। ‘আন্ডার প্রেশার :দ্য স্কুইজড মিডল ক্লাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনের মূল ভাষ্য হইল—ধনী দেশগুলিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংকোচন হইতেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ গবেষণা সংস্থা ওয়েলথ এক্সের হিসাবেও দেখা যায়, ২০১২ সাল হইতে পরবর্তী পাঁচ বত্সরে বাংলাদেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বাড়িয়াছে গড়ে ১৭ শতাংশ। এই হার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশের চাইতে অধিক। এই ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রহিয়াছে। একদিকে উচ্চবিত্তের সংখ্যা বাড়িতেছে, অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসাভাড়া বাবদ খরচ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশে মধ্যবিত্তরাও রহিয়াছেন মহাবিপদে।

পৃথিবীতে যত পরিবর্তন হইয়াছে তাহার পিছনে আছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। ভারত ও বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতাসংগ্রামে মধ্যবিত্তদের সীমাহীন ত্যাগ রহিয়াছে। বাংলাদেশের রাজনীতির নানা উত্থানপতনে তাহাদের নেতৃত্বই ছিল অগ্রগামী। কিন্তু আজকাল মধ্যবিত্তরা রাজনীতি ও ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হইতে অনেকটা ছিটকাইয়া পড়িতেছেন। তাহারা হয়তো সংখ্যায় বাড়িতেছেন, তবে সমাজে তাহাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কমিতেছে। তাহারা একসময় ইউরোপ-আমেরিকার উঁচু উঁচু ভবন দেখিয়া বিস্মিত হইতেন, এখন তাহারা দেশে এমন বহুতল উঁচু ভবনে বসিয়া অফিস করিতেছেন বা থাকিতেছেন। তাহার পরও তাহাদের মন হইতে অতৃপ্তি দূর হইতেছে না। অবশ্য তাহাদের প্রধান স্বপ্ন একটি বাড়ি ও উচ্চশিক্ষা, যাহা আজ ব্যয়বহুল। তাহাদের আরেকটি চাওয়া নিরাপদ চাকুরি, যাহা এখন পরিণত হইয়াছে সোনার হরিণে। এই জন্য তাহাদের অবস্থা এখন মধ্যসমুদ্রে ঝড়ের কবলে পড়া নৌকার যাত্রীদের মতো। এমতাবস্থায় ধৈর্য ধারণ, অল্পে সন্তুষ্টি অথবা আরো অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা মানসিক পরিবর্তন ছাড়া এই অতৃপ্তি দূর করা কঠিন।