জামিনের সুস্পষ্ট অপব্যবহার করলেই অধস্তন আদালত হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বাতিল করতে পারবে। তবে জামিনের মেয়াদ শেষ হলেও জামিন প্রশ্নে জারিকৃত রুল বা আপিল বিচারাধীন থাকলে নিম্ন আদালত জামিন বাতিল করে আসামিকে জেলহাজতে প্রেরণ করতে পারবে না মর্মে চার দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এ রায় দেন। চট্টগ্রামের জনৈক মো. ইব্রাহিমের জামিন বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গতকাল বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান। হাইকোর্টের এই নির্দেশনা অধস্তন আদালতের বিচারকদের অনুসরণের লক্ষ্যে তা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে বলা হয়েছে।
রায়ের নির্দেশনাগুলো হচ্ছে: হাইকোর্ট বিভাগ থেকে কোনো আসামি যদি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জামিনে মুক্তি পান এবং জামিনের সুস্পষ্ট অপব্যবহার ব্যতীত অধস্তন আদালত সেই জামিন বাতিল করতে পারবেন না। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জামিনে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তি যদি অধস্তন আদালতে নিয়মিত হাজিরা দেয় শুধু হাইকোর্টের জামিনের এক্সটেনশন অর্ডার (বর্ধিতকরণের আদেশ) না থাকার কারণে অধস্তন আদালত জামিন বাতিল করে জেলহাজতে প্রেরণ করতে পারবে না। নির্দিষ্ট সময়ে জামিন পাওয়ার পর যদি সেই সময় পার হয়ে যায় তবে হাইকোর্টে যেই রুল বা আপিলে জামিন দিয়েছে সেই রুল বা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অধস্তন আদালতকে অপেক্ষা করতে হবে। অধস্তন আদালত হাইকোর্টের দেওয়া জামিন কোনো অবস্থাতেই যেই রুলে বা আপিলে জামিন দিয়েছেন তা খারিজ না হওয়া পর্যন্ত বাতিল করতে পারবেন না, তবে যদি হাইকোর্ট কোনো শর্তসাপেক্ষে জামিন দেন সেই শর্ত ভঙ্গ করলে আসামির জামিন বাতিল করতে পারবে অধস্তন আদালত।
হাইকোর্টের এই রায়কে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে আইনজীবীরা বলছেন, এতে বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি কমবে। অধস্তন আদালতের বিচারকগণ এখন থেকে এই নির্দেশনা মেনে আদেশ দেবেন। কারণ আগে প্রায়শই দেখা যেত হাইকোর্ট থেকে জামিনের মেয়াদ বর্ধিত না হওয়ায় আসামিদের কারাগারে পাঠানো হতো। যদিও আসামি জামিনের কোনো অপব্যবহার করেনি।
প্রসঙ্গত মো. ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও থানায় ২০১৮ সালের ১৬ মে মামলা করেন মো. আবু বকর চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি। মামলায় তার আট বছরের ছেলেকে বলাত্কারের অভিযোগ আনা হয়। এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান আসামি। পরে তিনি হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেন। হাইকোর্ট ঐ বছরের ৭ সেপ্টেম্বর তাকে ছয় মাসের জামিন দেয় এবং জামিন প্রশ্নে রুল জারি করে। এরপর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরে তদন্ত শেষে ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। ২০১৯ সালের ১৯ জুন চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন আসামি। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তার আবেদন খারিজ করে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। এরপর তিনি আবেদন করলে গত বছরের ২৬ জুন হাইকোর্ট তাকে তিন মাসের জামিন দেয়। একই সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারককে তলব করেন। পরে এ ঘটনায় জারিকৃত রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেওয়া হয়।