আমাজনের দুর্দশা-৩

জ্বলছে আমাজন, ধুঁকছে বন্যপ্রানীরা

বিশ্বের বৃহত্তম অরণ্য আমাজন পুরো পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। তাই আমাজনকে পৃথিবীর ফুসফুস বলেই আখ্যায়িত করা হয় । ৭০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অরণ্যের প্রায় ৫৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকাটি মূলত আর্দ্র জলবায়ু দ্বারা বেষ্টিত। নাম না জানা নানা উপজাতির বাসস্থান সহ আমাজন জঙ্গলে রয়েছে ১৬ হাজার প্রজাতির গাছগাছালি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ দাবানলের শিকার হচ্ছে এটি। বর্তমান আমাজন ও তার প্রাণীকুলের ভয়াবহ দুর্দশা নিয়ে ধারাবাহিক ৩ পর্বের তৃতীয় ও শেষ পর্ব আজ।

ধারণা করা হয়, এখানে প্রায় এক হাজার ৩০০ প্রজাতির পাখি, তিন হাজার প্রজাতির মাছ, ৪৩০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী আর ২৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড়ের বাসস্থান এই অরণ্য। এই বনে মেলে খাবার উপযোগী তিন হাজারের বেশি প্রজাতির ফল।

জীববৈচিত্রে ভরা এই আমাজন অরণ্যের প্রাণীরা হুমকির মুখে রয়েছে কারণ কাঠ পাচারকারী এবং কৃষকরা নির্বিচারে জঙ্গল পুড়িয়ে দিচ্ছেন৷ ফলে প্রাণীদের জীবন হচ্ছে বিপন্ন৷ জানা গেছে,  বিচ্ছিন্নভাবে নয় হাজার জায়গায় লেগেছে আগুন, যা ব্রাজিল ছেড়ে এসে পড়েছে পাশের বলিভিয়া, পেরু ও প্যারাগুয়ের বনাঞ্চলেও৷ মহাকাশ থেকেও দেখা যাচ্ছে পুড়তে থাকা আমাজন৷ আমাজন রেইনফরেস্টে আগুনের কারণে বহু প্রাণী মারা গেছে৷ অনেক প্রাণী জঙ্গল থেকে বাঁচতে লোকালয়ে গিয়ে গাড়িচাপায় প্রাণ হারাচ্ছে৷ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছে আমাজনের দাবানলে আহত ও মৃত বেশ কয়েকটি বন্যপ্রাণীর ছবি।

সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সে আমাজনের একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে,  মৃত নবজাতককে জড়িয়ে ধরে আছে মা বান। , তার চোখ- মুখে যেন শোকের ছায়া৷ মা ও নবজাতক দুই জনই প্রাণের ভয়ে আমাজন অরণ্যের দাবানলের আগুন থেকে রক্ষার জন্য পালিয়েছিল, কিন্তু লোকালয়ে এসেও শেষরক্ষা হলো না সন্তানটির৷ প আমাজনের পোর্তো ভেলহো শহরের কাছে একটি গাড়ির নীচে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছে শিশু বানরটি৷ পরে ক্লিনিকে এনেও বাঁচানো যায়নি তাকে৷

 ন্যাশনাল জিওগ্রাফির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মিলটন’স টিটি বা স্যাডলব্যাক ট্যামারিনের মতো বেশ কিছু বানর শুধু আমাজনেই পাওয়া যায়৷ এই দুই প্রজাতির বানর আমাজনের যে অঞ্চলে পাওয়া যায়, সেই অঞ্চলই এখন আগুনের কবলে৷ হাতেগোনা যে কয়েকটি টিটি বা ট্যামারিন সেখানে থাকার কথা, কিন্তু এখনো তাদের কোনো খবর পাওয়ার যায়নি৷

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ অ্যামাজোনিয়ান রিসার্চের গবেষক উইলিয়াম মাগনুসন সাম্প্রতিক আগুনের ফলাফলকে দুই ভাগ করছেন- তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী৷ এর আগে বনের ঘনত্বের কারণে কখনোই পুরোপুরি পুড়ে যায়নি আমাজন ৷ বৃষ্টি হলে আপনা থেকেই নিভে যেত আগুন৷ তবে বন ধ্বংস হওয়ায় এবারও তা হবে কি না, তা এখনই বলতে পারছেন না কেউ৷

মাগনুসন আরো বলেন,দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি তাৎক্ষণিক ক্ষতির চেয়ে আরো ভয়ঙ্কর হবে বলে ধারনা তার ৷ পুড়ে যাওয়া অঞ্চলের গোটা ইকো-সিস্টেমই বদলে যাবে৷ ফলে, গোটা আমাজনে স্বাভাবিক যে ‘ফুড চেইন’ বা খাদ্য শৃঙ্খল চলে আসছে, তা পাল্টে যাবে৷ হাজার হাজার বছর ধরে বিবর্তন এখানে যে স্বাভাবিকতায় পৌঁছেছিল, তা নস্যাৎ করে দিতে পারে এই আগুন৷

উইলিয়াম মাগনুসনের মতে, একদিকে আগুনের ফলে জীব-বৈচিত্র্যের হারিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর বাজার-প্রীতির রাজনীতি৷ এই দুইয়ের কারণেই বারবার আমাজনে আগুন লাগানো হচ্ছে, যাতে মাটি সাফ করে সেখানে ব্যবসার সুযোগ গড়ে তোলা যায়৷ এমন পরিস্থিতি থাকলে আমরা হয়তো বেশ কিছু প্রজাতি আবিষ্কার করার আগেই চিরতরে হারিয়ে ফেলব।

ইত্তেফাক/এএইচপি/এআর