হিপোক্রেটিসের দর্শন ও করোনা

নজরুল ইসলাম

 

রোগজীবাণুর সঙ্গে মানুষের যুদ্ধ চলছে অনাদিকাল থেকে। দিনে দিনে রোগজীবাণু শক্তিশালী হয়েছে, অন্যদিকে উপশমের নতুন পন্থাও আবিষ্কৃত হয়েছে। আজকের চিকিত্সাবিজ্ঞান যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তা নিশ্চিতভাবে চিকিত্সাবিজ্ঞানী ও চিকিত্সকদের হাত ধরেই এসেছে। আমাদের জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে মহান সৃষ্টিকর্তার পরেই রয়েছে চিকিত্কদের অবদান। গত শতাব্দীর সেরা আবিষ্কারের জন্য যখন সমগ্র বিশ্বব্যাপী জরিপ করা হলো—দেখা গেল হিগস-বোসন কণা কিংবা রোবটিক্সের মতো প্রযুক্তিকে পিছনে ফেলে মানুষ এক্স-রশ্মি এবং পেনিসিলিনকে বেছে নিয়েছে।

সবাই এখন আশায় আছে, কখন চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা একটা ভ্যাকসিন আবিস্কার করবেন; কখন একটা এন্টিভাইরাল ড্রাগ নিয়ে উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হবেন। পৃথিবীতে যে দুটি দেশ তাদের জিডিপি-র সবচেয়ে বেশি অংশ গবেষণায় খরচ করে, দক্ষিণ কোরিয়া তার একটি। যখন স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষায় পিপিই, গ্লাভস, মাস্ক সরবরাহ করতে গিয়ে উন্নত দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়া এক ধরনের বুথ চালু করেছে যার ভেতরে থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা পিপিই ছাড়াই সম্ভাব্য আক্রান্তদের নমুনা সংগ্রহ করতে পারছেন। আমরা যদি শিক্ষা ও গবেষণায় জিডিপি-র সবচেয়ে বেশি অংশ ব্যয় না করে যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে অর্থ ও সময় ব্যয় করি, তাহলে প্রয়োজনের সময় কিভাবে ভ্যাকসিন বা এন্টিভাইরাল ড্রাগ দ্রুত পাওয়ার আশা করি?

মহান গ্রিক চিকিত্সক হিপোক্রেটিসকে চিকিত্সাবিজ্ঞানের জনক বলা হয়, যিনি দ্বিতীয় হিপোক্রেটিস নামেও পরিচিত। তিনি চিকিত্সাশাস্ত্র শেখাতেন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে; তিনি জোর দিতেন ডাক্তার ও রোগীর মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের এবং বিভিন্ন রোগের বিভিন্ন মৌলিক তত্ত্বের ওপর। তাঁর সম্পর্কে যে উক্তিটি এখনো আমাদের অনুপ্রাণিত করে তা হলো ‘তিনি একই ভুল দ্বিতীয়বার করেননি’। হিপোক্রেটিসের একটা দর্শন হচ্ছে, রোগীর চিকিত্সা কর, রোগের নয়। আজো চিকিত্সাবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেওয়ার সময় যে শপথ পাঠ করতে হয়, তা হিপোক্রেটিসের শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে।

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারিতে যখন স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আক্রান্তদের চিকিত্সাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তখন আমরা যদি চিকিত্সাবিজ্ঞানী, চিকিত্সক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অবদানের কথা এড়িয়ে যাই, তাহলে সেটা অশোভন হবে। সব পেশাতেই ভুল দুইবার করার সুযোগ থাকে না, যেমন চিকিত্সাপেশায়। তবে হিপোক্রেটিস যেহেতু একই ভুল দ্বিতীয়বার করেননি, অবশ্যই তাঁর শিষ্যদেরও সেই গুণ রয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস।

ঢাকা