ভিয়েতনামে মানব পাচার

প্রলোভন ভালো চাকরির, টানতে হয় কলাগাছ

শরীয়তপুর জেলার পালং থানার গয়ঘর গ্রামের যুবক আলমগীর হোসেন। দালালদের প্রলোভনে পড়ে জীবনজীবিকার তাগিদে জায়গাজমি বিক্রি, বন্ধক ও সুদের ওপর অর্থ সংগ্রহ করে সোনার হরিণ ধরার আশায় গিয়েছিলেন  ভিয়েতনামে। আর ভিয়েতনামে যাবার ছয় মাসের মাথায় পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরেছেন তিনি। একইভাবে সঙ্গে ফিরেছেন প্রতারিত আরো ১০৫ জন। যাদের মধ্যে ৮১ জনের থানা হাজতবাস শেষে ঠাঁই হয়েছে কারাগারে। আলমগীর হোসেনের কথায়, ‘আমি তাদের থেকে ভাগ্যবান, কারণ দেশে ফিরে আমাকে কারাবাসে যেতে হয়নি।’ ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান দালালদের মাধ্যমে ভিয়েতনাম যাওয়া, সেখান থেকে দেশে ফেরার শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী। দেশে ফেরার পর সিআইডির (পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ) নির্দেশে গত ৫ সেপ্টেম্বর আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে পল্টন থানায় মামলা করেন। মামলার আসামি করেছেন  দালাল মাসুদ রানা, মতিয়ার রহমানকে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

আলমগীর হোসেন জানান, তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে দালাল মতিয়ারের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে মতিয়ার নিয়ে যায় পুরানা পল্টনের আদম ব্যবসায়ী মাসুদ রানার কাছে। চুক্তি হয় ৪ লাখ টাকায়। ভিয়েতনামে ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরি। প্রতি মাসে ভালো বেতন পাওয়া যাবে। টাকা পরিশোধের কয়েক দিনের মধ্যেই জানানো হয় ভিসা রেডি। ভিয়েতনামে যাবার পথ ঢাকা-কলকাতা। কলকাতা থেকে সরাসরি ভিয়েতনাম। আলমগীরের সঙ্গে ছিল আরো পাঁচ জন। ভিয়েতনামে পৌঁছার পর তাদেরকে সে দেশের এয়ারপোর্টে রিসিভ করে বাংলাদেশি দালাল আবদুল জব্বার,  মোস্তফা, গোলাম আজম সুমন, কল্পনা, আজমির, মিলন, শোভন ও আতিক। দালালরা তাদের ছয় জনকে মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যায় তাদের আস্তানায়। সেখানে নেওয়ার পর তাদের সঙ্গে থাকা ৬ হাজার ডলার ও পাসপোর্ট নিয়ে নেয়। প্রথম দুই-এক দিন দালালরা ভালো ব্যবহার করলেও পরে তাদের আসল রূপ প্রকাশ পায়।

আলমগীর হোসেন বলেন, যে কাজের কথা বলে নেওয়া হয়েছিল, তার বদলে তারা আমাদের কুলির কাজে নিয়োজিত করে। কখনো বনে ঘাস কেটেছি, কখনো সিমেন্ট বালুর বস্তা টানা, আবার কখনো ঘাড়ে করে গরুর খাবারের জন্য কলাগাছের টুকরো টেনেছি। প্রতিবাদ করায় তারা এক সময় আমাদেরকে তাদের আস্তানা থেকে বের করে দেয়। পরবর্তী সময়ে আমাদের দিন কাটে পথে পথে। শুধু আমরাই নই, আমাদের মতো অনেকেরই একই অবস্থা।

আলমগীর বলেন, বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় গত ১৮ আগস্ট ভিয়েতনাম থেকে আমাদেরসহ ১০৬ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। করোনার কারণে উত্তরা দিয়াবাড়ীর ক্যাম্পে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। তবে ভিয়েতনামের অভিযোগের ভিত্তিতে ৮৩ (এর মধ্যে দুই জন কাতারফেরত) জনকে গ্রেফতার করা হয়। আমিসহ বাকিদের পুলিশ ছেড়ে দেয়।

এ ব্যাপারে তুরাগ থানার সাব ইন্সপেক্টর আনোয়ার হোসেন বলেন, ভিয়েতনাম থেকে আসা ৮১ ও কাতার থেকে আসা দুই জনকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে ২ সেপ্টেম্বর কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি আরো বলেন, আটককৃতদের সিআইডি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য সংশ্লিষ্টদের স্ব স্ব থানায় ইনকোয়ারি স্লিপ পাঠানো হয়েছে।

৮৩ জনকে আটক প্রসঙ্গে ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) নাবিদ কামাল শৈবাল বলেন, নানা অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে তারা সেখানে জেল খেটেছেন। পরে তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে তাদের সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে জানা যায়নি। তাই সন্দেহজনক হিসেবে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। অপর দিকে সম্প্রতি র্যাব-৩ রাজধানীর পল্টন এলাকা থেকে ভিয়েতনামে মানব পাচারকারী চক্রের মূল হোতাসহ তিন জনকে গ্রেফতার করে। তারা হলেন দাগনভূঞার রাজাপুরের কামাল হোসেন ও তার ভাই জামাল হোসেন এবং জামাল উদ্দিন নামে অপর একজন। এ ব্যাপারে র্যাব-৩ এর সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাকিবুল হাসান জানান, গত ৩ জুলাই বিশেষ ফ্লাইটে ভিয়েতনাম থেকে ফেরত আসেন ১১ বাংলাদেশি অভিবাসী। এছাড়া আরো ২৭ জন ভিয়েতনামে আটক অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ফেরত আসা ১১ জনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে র্যাব অনুসন্ধান শুরু করেছে।