জ্বালানি খাত আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি তেল বিক্রি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯-এর কারণে জ্বালানি খাত স্থবির হয়ে পড়ে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ব্যবহারের মাধ্যমগুলো করোনা মহামারি ও লকডাউনের কারণে প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সারা বিশ্বে জ্বালানি তেল বিক্রি খাতে সবাইকেই বিশাল অঙ্কের অর্থ লোকসান দিতে হয়। জ্বালানি তেলের দাম কমতে কমতে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যা কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি।
জ্বালানি তেল খাতে বিপর্যয়ের সুযোগ গ্রহণ করে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ। তারা এ সুযোগে তাদের মজুত বৃদ্ধি করে। বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো কয়েক মাস পর্যন্ত জ্বালানি সংকট থেকে নিরাপদ থাকতে তেলের মজুতাগার গড়ে তুলেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেরও কয়েকটি স্থানে আপত্কালীন বড় বড় মজুতাগার গড়ে তোলা হয়েছে। করোনা মহামারিতে চীনসহ কয়েকটি দেশ জ্বালানি তেল মজুত করে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। কোভিড-১৯-এর প্রকোপ কিছুটা কমে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের ব্যবহার অনেকটা পূর্বের অবস্থায় ফিরে এসেছে।
বাংলাদেশে বিপিসিই জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। বিপিসি আমদানি করা তেল তার সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মাধ্যমে বাজারজাত ও বিক্রি করে থাকে। বিপিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত জ্বালানি তেলের বিক্রি গত কয়েক বছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি ছিল। বিপিসির আমদানি করা ছয়টি ফুয়েলের মধ্যে রয়েছে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিন, ফার্নেস অয়েল (এফও) এবং জেটএ-১। এর মধ্যে এয়ার পরিবহনে ব্যবহূত জেট এ-১-এর বিক্রি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। কারণ বিশ্বব্যাপী আকাশপথে চলাচল অনেকটা বন্ধ রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিপিসি কর্তৃক এপ্রিল ও মে মাসে জ্বালানি তেল বিক্রি সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। কোভিড-১৯-এর কারণে যানবাহন চলাচল অনেকটা বন্ধ থাকায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়। এই দুই মাসে বিক্রি কমে যাওয়ায় জ্বালানি তেলবাহী অনেক জাহাজকে অনেকদিন খালাসের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। কারণ বিপিসির তেল মজুত ক্ষমতা পর্যাপ্ত না হওয়ায় ট্যাংকগুলো খালি না হওয়া পর্যন্ত জাহাজগুলোকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে করে জাহাজগুলোর কর্তৃপক্ষকে বিরাট অঙ্কের ডেমারেজ চার্জ দিতে হয়েছে বিপিসিকে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মার্চ মাসে বিপিসি ডিজেল বিক্রি করে প্রায় ৪ লাখ ১২ হাজার টন। কিন্তু কোভিড-১৯-এর কারণে এপ্রিল মাসে বিক্রি নেমে আসে প্রায় অর্ধেকে অর্থাত্ ২ লাখ টনে। মে মাসে ডিজেল বিক্রি ২ লাখ টনেরও নিচে নেমে আসে। কিন্তু কোভিড-১৯ থেকে উত্তরণে এবং সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিথিল হওয়ায় জুন মাসে ডিজেল বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার টনে। জুলাই মাসে ডিজেল বিক্রি আরো বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার টনে পৌঁছায়। আগস্ট মাসে বিক্রি হয় প্রায় ৩ লাখ টন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী জুন, জুলাই এবং আগস্ট মাসে ডিজেল বিক্রি গত বছরের একই সময়ে ডিজেল বিক্রির সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিপিসি কর্তৃক আমদানিকৃত জ্বালানির মধ্যে ডিজেল সবচেয়ে বেশি বিক্রি ও ব্যবহার হয়ে থাকে। এ বছর বিপিসি কর্তৃক মার্চ মাসে অকটেন বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ হাজার ৭০০ টন। কিন্তু কোভিড-১৯-এর কারণে এপ্রিল মাসে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ টনে। আবার পেট্রোল বিক্রি মার্চ মাসে ছিল প্রায় ৩১ হাজার টন। এপ্রিল মাসে বিক্রি কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার টন। কেরোসিন মার্চ মাসে বিক্রি হয় প্রায় ৯ হাজার টন। এপ্রিল মাসে তা প্রায় ৪ হাজার টনে নেমে আসে। কিন্তু জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের বিক্রি এপ্রিল ও মে মাসের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।