অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননায় ভূষিত ৯ নারী ও এক ব্যান্ডদল

বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য প্রতি বছরের মতো ১০ কৃতী নারীকে ‘অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা ২০১৯’ প্রদান করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাতে নিজস্ব ফেসবুক পেজ থেকে এক অনলাইন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের ১০ কৃতী নারীকে দেওয়া হয় এ সম্মাননা। দৈনিক ইত্তেফাক ও পাক্ষিক অনন্যার সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

এবছর শিক্ষায় এমন এক নারী অনন্যা সম্মাননা পেলেন যিনি নিজে পাহাড় সমান প্রতিকূলতা ঠেলে পড়াশুনা করেন। পেশা হিসেবে বেছে নেন শিক্ষকতাকেই ।

৯০ ছুঁই ছুঁই গারো চিরকুমারী প্রতিভা সাংমা এক সময় নিজের গ্রামে ফিরে যান। পরে মধুপুর বনাঞ্চলে শতাধিক মিশনারির প্রাইমারি ও তিনটি উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়। তার গ্রামের ২০০ গারো পরিবারে এখন কোনো অশিক্ষিত মানুষ নেই। আর একজন অনন্যা হলেন প্রবাদপ্রতিম দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহার একমাত্র পুত্রবধূ শ্রীমতি সাহা। নারী শিক্ষা, দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান, সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করাসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা রণদাপ্রসাদ সাহার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে চলেছেন তার পুত্রবধূ। অপরজন শত শিশুর মা হাজেরা বেগম। যাপিত জীবন তার কাছে এক ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি। তিনি দেখেছেন গাঢ় অন্ধকার জগত্। তাই তিনি আলোর দিশারী হয়ে তুলে এনেছেন ঐ জগতের শিশু-কিশোরদের। জীবনের ছলনায় এক সময় তাকে যৌনকর্মীর কাজ করতে হয়েছে। সেই পেশা ছেড়ে তিনি যৌনকর্মীর সন্তানদের লেখাপড়া, খাবার ও আশ্রয়ের জন্য নিজের সবকিছু উত্সর্গ করেন। অনুপ্রেরণা পেয়েছেন ফালগুনী সাহার। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় বিদ্যুত্পৃষ্ট হয়ে তার দুই হাতের কনুই পর্যন্ত পুড়ে যায়। কনুই থেকে কেটে ফেলা হয় তার দুটি হাত। কাটা হাতে ফাল্গুনী পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পায়, এসএসসি এবং এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে এবং কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন স্নাতকোত্তর। ইসরাত খান মজলিশ পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। শখ করে বছর খানেক আগে টিভিএসের ওয়েগো ১১০ সিসির একটা স্কুটি কেনেন। যা দিয়ে অফিসে যান আর প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ওমেন রাইডার্স ক্লাব। সাংবাদিক সুমনা শারমিন মনে করেন, ভালো সাংবাদিক হতে হলে পড়াশোনার পাশাপাশি মাঠে কাজ করতে হবে, পাশাপাশি ‘কমনসেন্স’ খুব গুরুত্বপূর্ণ। সুমনা হলেন সেই সব প্রদীপের মতো, যারা অন্যদের আলো দান করেন, কিন্তু নিজে থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ইতির ধারেকাছে কেউ ঘেঁষতে পারত না। কিন্তু সেই ইতির যখন মাত্র ১২ বছর বয়স, তখন অভাবি ঘরের বাবা-মা বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তার। ইতি এক রকম পালিয়ে চলে আসেন আর্চারির আশ্রয়তলে। আজ ইতি দেশের রত্ন, দক্ষিণ এশিয়ার বিস্ময়! এসএ গেমসের আগে জাতীয় প্রতিযোগিতায় ইতি ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। সেখান থেকে এসএ গেমসে গিয়ে জেতেন হ্যাটট্রিক সোনা। ইতির স্বপ্নটা এখন আরো দূরে, অলিম্পিকে।

বাংলাদেশের আইটি খাতে নারীর অগ্রযাত্রায় অনন্য এক দৃষ্টান্ত নাসিমা আক্তার নিশা। বর্তমানে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছেন তিনি। গিটারের একটি কর্ডের নাম এফ মাইনর। সেই নাম অনুসারে পাঁচটি মেয়ে একটি গানের দল তৈরি করেন। আর তাদের গাওয়া গান হূদয় জয় করে লাখো মানুষের। ব্যান্ডদল হিসেবে তারাও পান এ সম্মাননা। ফরিদা জামান ১৯৭৮ সালে ভারতের বরোদার এমএস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় এমএফএ এবং ১৯৯৫ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন। এ পর্যন্ত তার আটটি একক প্রদর্শনী হয়েছে এবং শতাধিক দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে অধ্যাপনা করছেন। পেয়েছেন এ বছর অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, দেশের নারীদের অবদানের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সম্মান জানিয়ে আসছে পাক্ষিক অনন্যা। ২০০৭ সালে আমাকেও রাজনীতিতে এ সম্মাননা জানানো হয়। এমনকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও শীর্ষদশ সম্মাননায় ভূষিত করেছে অনন্যা। বক্তব্যের শেষে বিভিন্ন অঙ্গনে নারীদের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ অনন্যার এই উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সভাপতির বক্তব্যে পাক্ষিক অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, এখনো সময়টা নারীদের জন্য খুব অনুকূল নয়। সমাজ থেকে এখনো বৈষম্য দূর করা যায়নি। উগ্র মৌলবাদীরা নারীর অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। নিজেদের বঞ্চনার কথা বলতে এখনো মেয়েরা ভয় পায়। একদিকে যেমন দেশের নারীদের সেই বঞ্চনা আর ভয় দূর করতেও কাজ করে যাচ্ছে অনন্যা, তেমনি অন্যদিকে তাদের অর্জন, সাফল্য আর অবদানকে সম্মান জানাতেই অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা।

প্রসঙ্গত, বিগত প্রায় তিন দশক ধরে পাক্ষিক অনন্যা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল ও প্রতিষ্ঠিত নারীদের স্বীকৃতি দিয়ে আসছে। এর মাধ্যমে নারীর অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, অর্থনীতি, অভিনয়, সংগীত, খেলাধুলা, শিক্ষা, চিকিত্সা, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজকল্যাণ তথা আইন, মানবাধিকার, ব্যবসায় উদ্যোগ, রাজনীতি, সাংবাদিকতা প্রভৃতি অঙ্গনে যেসব নারী উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন তাদের কর্ম সাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ এই শীর্ষদশ সম্মাননা।