আমাদের গুবলু। সে নাকি আবার গোয়েন্দা! আচ্ছা তোমরাই বলো, গোয়েন্দাগিরি কি এতই সোজা! গোয়েন্দা ছিলেন বটে আমাদের ফেলুদা। ফেলু মিত্তিরের ওপরে আবার কথা চলে নাকি! সাথে জটায়ু আর ভাতিজা তোপসে। এই তিনে মিলে যা সব কাণ্ড করেছেন, তা আর বলার নয়।
তাদের দেখাদেখি গুবলুও গোয়েন্দাগিরিতে নেমে পড়ল। সাথে আছে তার প্রিয় বন্ধু নোবেল আর সজল। এই ত্রিমূর্তি মিলে পাড়ার মোড়ে একখানা দোকান খুলে বসেছে। শোলায় বানানো বোর্ডের গায়ে লাল কালিতে লেখা, ‘এইখানে সবরকম রহস্যের সমাধান দেয়া হয়’।
কিন্তু গোয়েন্দার দোকান খুলে বসলেই তো হবে না, কাজ চালানোর মতো মালমসলা চাই। গুবলু করেছে কি, ওর দাদুর পুরনো একটা ভাঙা চশমার কাচ দিয়ে ম্যাগনিফাইং গ্লাস বানাল, গেল বছর পৌষমেলা থেকে কেনা ‘রিমঅলা’ দুটো বেতের টুপির একটা সে নিজে পরেছে, আরেকটা পরিয়েছে নোবেলকে। তাতে আবার সজলের খুব গোস্সা হয়। কেন, সে কি এই অ্যাজেন্সির কেউ নয়! তাকে কেন টুপি পরানো হলো না।
গুবলু মুচকি হেসে বলে, হবে হবে, আগে কেসটেস আসতে দে। নিত্য নগদ কিছু কামাই হলে শুধু টুপি কেন, পায়ের চটিও কিনে দেবো ভাই। রাগ করিস না।
ভাঙা চশমা, বেতের বুনানো টুপি, একটা ছোটোখাটো লাঠি, ফেলুদা বিষয়ক কিছু পুরনো বই—এই নিয়ে অ্যাজেন্সি দিয়ে বসল গুবলু গোয়েন্দা। কিন্তু কেস তো আর আসে না। যা আসে তা মোটে ধর্তব্যের নয়। স্কুল শেষে ওরা আর বাড়ি ফেরে না। খেলার মাঠে যাবার কথা বলে ওরা গোয়েন্দার দোকান খুলে বসে থাকে। তাতে পড়ালেখা যেমন লাটে উঠল, দিনকে দিন বন্ধুরা ওদের নিয়ে রীতিমতো ঠাট্টা-মশকরা করতে লাগল।
গাঁয়ের লোক ‘গোয়েন্দা’ কী জানে না। এদের দিয়ে কী হয়, খায় নাকি মাথায় দেয়, এরা কার বন্ধু—চোরের নাকি পুলিশের, এমন সব উদ্ভট প্রশ্ন তাদের মাথায় উঁকি দেয়। বেশি কৌতূহলী যারা, তারা মাঝেসাঝে এসে উঁকিঝুঁকি মারে, কিন্তু সাহস করে কেউ গুবলু গোয়েন্দার সাথে বািচত অব্দি করে না। কেউ একজন আবার রটিয়ে দিলো যে, গোয়েন্দারা পুলিশেরও বেশি, পুলিশ যখন কোনো কেসে ঠিক জুত করতে পারে না, তখন খোদ দারোগা এসে গোয়েন্দার কাছে হেল্প চায়।
মাসখানেক যাবার পর একটা কেস পেল গুবলু। কেস আর কী, ওপাড়ার হারু মুচির নাদুসনুদুস দেখতে দুটো মোরগ ছিল। তাই নাকি কে বা কারা চুরি করেছে। হারু এখন কী করে! সামান্য মানুষ সে। মোরগে ডিম পাড়ে না ঠিক আছে, কিন্তু হাটে নিয়ে গিয়ে বেচলে অন্তত ছ’শ টাকা তো পেতই। শাঁসালো কেউ এলে তার বেশিও বেচাবিক্রি হতে পারত।
গুবলু কিন্তু কেস পেয়ে বেজায় খুশি। তক্ষুনি সে এত্তেলা পাঠাল। সজল আর নোবেল সারা গাঁ ঘুরে খোঁজ নিয়ে এল। যা খবর আনল তা শুনে বেচারা গুবলু মুষড়ে পড়ল খুব। পাড়ার দুষ্টু ছেলেরা নাকি সেই মোরগ মেরে কেটেকুটে খেয়েও ফেলেছে। তার পালক অব্দি অবশিষ্ট নেই। তার মানে প্রথম কেসেই ফেল মেরে গেল ফেলুদার সাগরেদ গুবলু গোয়েন্দা।
বেচারা মন খারাপ করে বসে আছে। তারপর এল এক জবরদস্ত কেস। গাঁয়ের যে মোড়ল তার একটা দুধেল গাই ছিল। ওটা চুরি গেছে। মোড়ল এসে বলতে গেলে ওদের হাত-পা জড়িয়ে ধরল। বাবা-বাছা করে বলল, যেমন করেই হোক, আমার গাই খুঁজে আনা চাই। কাজটা ঠিকঠাক করতে পারলে মোটা টাকা ইনাম পাবে। মানে বকশিস।
মোড়লের গরু হারিয়েছে, বেশ তো, চল খুঁজে আনি। গরু তো আর মানুষ নয় যে ইচ্ছেখুশি কোথাও চলে যাবে। গুবলু বেশ ভাব নিয়ে বলল। যেন এটা তার বাঁ হাত কা খেল। মামুলি ব্যাপার! দিন দশেক ঘুরেও কাজের কাজ কিছু হলো না, গরু পাওয়া গেল না। সজল তখন এক খবর আনল। পাশের গায়ের বাঁশঝাড়ে নাকি একটা গরুর কবর পাওয়া গেছে। ওদের অনুমান, সেখানে গেলে মোড়লের গাইয়ের হাড্ডিগুড্ডি পাওয়া যাবে। জীবিত না হোক মৃত পাওয়া গেলেও সেটা গুবলুর সাফল্য বটে।
মোড়লকে নিয়ে ওরা পাশের গাঁয়ে গেল। গিয়ে দেখে সত্যি সত্যি গরুর কঙ্কাল। মাথাও পাওয়া গেল। সেটা দেখিয়ে গুবলু বলল, মোড়লসাব, এবার আমাদের ইনাম দেন। এই নিন আপনার গরু।
মোড়ল মোটে কাঁচা লোক নন। তিনি মেলা দেখেশুনে তারপর রেগে বললেন, এই নাকি তোমার গোয়েন্দাগিরি! এটা তো গরু নয়, এটা ঘোড়া। দেখছ না, এর দু পাটিতেই দাঁত আছে। গরুর নিচের পাটিতে দাঁত থাকে না। বোকা ডিটেকটিভ কোথাকার! লজ্জা পেয়ে গুবলু সেই যে কাজে ইস্তফা দিলো, আর কখনো গোয়েন্দাগিরির নাম মুখে আনেনি।