গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান, কৃত্রিম উপগ্রহ

মাধব রায়, সহকারী অধ্যাপক

ব্লু বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট

গল্পে গল্পে বেলা বেড়ে গেলে কমলা বললেন— ভাবি, এখন উঠতে হবে যে, রান্না ঘরের কাজ অনেকটাই বাকি। কী খাবেন আজকে বলুন তো।

আনজুম বললেন— আপনার চয়েস। আপনি যা রাঁধবেন, সবই মজা হবে।

না, তবু, আপনার কী খেতে ইচ্ছে করে, বলুন।

আনজুম বললেন— কোনো কিছুর ভর্তা টর্তা হলে ভালো।

ঠিক আছে, বলে কমলা চলে গেলেন। তিনি ভাবলেন আজকে অনেকগুলো ভর্তার সমাহার হলে সবাই খুশি হবে। ফ্রিজে টাকি মাছ আছে, বের করলেন। আলুভর্তা হবে, মুসুর ডাল সিদ্ধ করে পিঁয়াজ কাচামরিচ ভেজে ডালভর্তা, শুটকি মাছ ভর্তা, আগুনে পুড়ে বেগুন ভর্তা। এই পাঁচ ধরনের ভর্তা, সাথে ডাল আর পাবদা মাছের ঝোল হলে দুপুরের খাওয়াটা মন্দ হবে না।

এমন সময় তানভীর সাহেবের ফোন এলো, আনজুম ধরলেন। মানিব্যাগটা ফেলে গেছেন তানভীর সাহেব। প্যান্টের পকেটে মানিব্যাগ নেই, বাসায় ফেলে গেলে তো ভালোই। আনজুম উঠে গিয়ে বেডরুমের ড্রেসিং টেবিলের ওপর দেখতে পেলেন। বললেন— তুমি এতো ভুলে যাওয়া শুরু করেছ। মানিব্যাগ ছাড়া অসুবিধা হবে না ?

তানভীর সাহেব হেসে বললেন— না, এখানে তো কিছু কেনাকাটার বিষয় নেই। আসার সময় তো গাড়িতেই আসব।

চা খেয়েছো ?

হ্যাঁ, খেয়েছি। তুমি ?

আমি খেয়েছি, এখন গল্প করছি। গল্পকথায় পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করছি। সিলেবাসে কী কী ইনক্লোড করেছো ?

মোটামুটি চিটাগাং ইউনিভার্সিটির মতোই। তেমন পার্থক্য নেই। বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়েই সিলেবাসের একটা সিমিলারিটি আছে।

স্যাটেলাইট রেখেছো ?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, স্যাটেলাইট ছাড়া তো হবেই না। এখন তো এই স্যাটেলাইট খুবই আলোচিত একটা বিষয়। বিশেষ করে নিউ হরাইজন প্লুটোর কাছে পৌঁছার পর। আচ্ছা ঠিক আছে, এখন রাখছি।

আনজুম আবার গল্পে যোগ দিলেন। আকাশ বলল— স্যাটেলাইট কী আন্টি ?

আনজুম বললেন— স্যাটেলাইট মানে উপগ্রহ।

উপগ্রহ মানে তো চাঁদ —বলল অণু।

উপগ্রহ মানেই চাঁদ নয়, বললেন আনজুম। চাঁদ হলো পৃথিবীর একটা উপগ্রহ, প্রাকৃতিক উপগ্রহ। উপগ্রহ দুই ধরনের। প্রাকৃতিক উপগ্রহ, চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে বলে এটি প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং অন্যটি হলো কৃত্রিম উপগ্রহ।

অণু বলল— তাহলে গ্রহের চারদিকে ঘুরছে বলে একে উপগ্রহ বলছি আমরা ?

হ্যাঁ। নক্ষত্রের চারদিকে ঘুরছে গ্রহ। যেমন সূর্যের চারদিকে গ্রহগুলো ঘুরছে। আর গ্রহের চারদিকে ঘুরছে উপগ্রহগুলি। এর মধ্যে আবার মানুষ কিছু কিছু উপগ্রহ তৈরি করে আকাশে ছেড়ে দেয়। সেগুলো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। এইগুলোকে বলে কৃত্রিম উপগ্রহ।

কিন্তু এইগুলো কী কাজ করে ?

অনেক কাজ করে, বললেন আনজুম। এটি পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয়। সেই ছবি পৃথিবীতে গ্রহণ করার ব্যবস্থা আছে। স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো ছবি বিশ্লেষণ করে আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করতে পারি। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন এইগুলো।

সীমা বলল— আমি কিছুই বুঝতে পারছি না আন্টি। আপনি বলছেন মানুষ উপগ্রহ তৈরি করে আকাশে ছেড়ে দেয়,সেটি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। এটি কীভাবে ঘুরে ?

আনজুম বললেন— তোমরা তো মহাকর্ষ-অভিকর্ষ বুঝেছো, তাই না ?

হ্যাঁ,বলল সবাই।

কোনো বস্তুকে যদি অভিকর্ষের সমান বলে বিপরীত দিকে ঠেলে দেয়া যায়, তবে যেখানে গিয়ে অভিকর্ষ বল নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে,সেখানে বস্তুটি চাঁদের মতো পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে থাকবে।

রেখা বলল- এরজন্য স্যাটেলাইটকে কত উঁচুতে পাঠাতে হবে ?

তা ধরো প্রায় 930 কিলোমিটার, বললেন আনজুম। এই উচ্চতায় তুলে ঘণ্টায় 39 হাজার কিলোমিটার বেগ দিয়ে পৃথিবীর সমান্তরালে ছেড়ে দিলেই এটি ঘুরতে থাকবে।

এতো বেগ ! অবাক হয়ে বলল বিন্দু।

হ্যাঁ, এতো বেগ। আর মজার ব্যাপার হলো, এই বেগটা এক ধাপে তোলা যায় না। তোলা হয় তিন স্তরে।

তিন স্তরে কেন ? বলল অণু।

তিন স্তরে তোলার কারণ হলো প্রথম স্তরে থাকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। সেখানে এতো বেগে বায়ুর সাথে ঘর্ষণ হলে আগুন জ্বলে উঠবে এবং স্যাটেলাইট পুড়ে যাবে। এই জন্য বায়ুস্তর অতিক্রম করার পর এই বেগ তোলা হয়। উপগ্রহটি বসানো হয় রকেটের মাথায়। জ্বালানি এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি রকেটের ভিতরে থাকে। রকেটেরও তিনটি স্তর থাকে। নিচু স্তরের রকেটটি অন্য দুটো রকেট এবং স্যাটেলাইট বহন করে খাড়াভাবে 80 কিলোমিটার উপরে উঠে গিয়ে খসে পড়ে। এতে করে বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে ঘনস্তরের সাথে ঘর্ষণ এড়ানো যায়। এরপর দ্বিতীয় রকেটটি ভূস্তরের সাথে 450 কোণ করে চলতে থাকে এবং তৃতীয় রকেটটিকে 160 কিলোমিটার উপরে তুলে দেয়। তখন এর বেগ হয় ঘণ্টায় 16 হাজার কিলোমিটার।

সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে এবং অবাক হচ্ছো। আনজুম আরো আকর্ষণীয়ভাবে বলছেন— এসময় দ্বিতীয় রকেটটি খসে পড়ে। তৃতীয় স্তরের রকেটটি ঘণ্টায় 39 হাজার কিলোমিটার বেগ সঞ্চার করে খসে পড়ে এবং উপগ্রহটি 930 কিলোমিটার উপরে উঠে ঘুরতে থাকে।

সীমা বলল— এই উপগ্রহ পৃথিবীকে ঘুরে আসতে কত সময় লাগে ?

দেড় ঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা।

এতো কম সময় ! অবাক হয় অণু।

হ্যাঁ, তবে কিছু কিছু স্যাটেলাইট আছে, যাদের আবর্তনকাল পৃথিবীর আবর্তনকালের সমান অর্থাত্ 24 ঘণ্টা। সেই উপগ্রহকে পৃথিবীর যে স্থান থেকে উেক্ষপণ করা হয়েছে, সেই স্থানেই স্থির থাকতে দেখা যায়। এদেরকে বলে ভূস্থির উপগ্রহ বা জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট। এর কক্ষপথকে বলা হয় পার্কিং কক্ষপথ।

এই স্যাটেলাইট দিয়ে কী কাজ করা হয় ?

এটি দিয়ে পৃথিবীর কোনো স্থানের সংবাদ, অনুষ্ঠান বা খেলাধুলা ইত্যাদি সমপ্রচার করা হয়।

হ্যঁ, সীমা বলল— গত ওয়ার্ল্ডকাপ ক্রিকেট খেলার সময় বলেছে, কোন স্যাটেলাই দিয়ে সমপ্রচার করা হয়েছে।

আকাশ বলল— স্যাটেলাইট দিয়ে আর কী কী করা যায়, আন্টি ?

অনেক কাজ করা যায়, বললেন আনজুম। যেমন পৃথিবীর আকার আকৃতি সম্পর্কিত ভূমিতিক সমীক্ষণ,বায়ুমণ্ডলের গঠন,চাপ,তাপমাত্রা পরিমাপ করা যায়,কসমিক রশ্মি পর্যবেক্ষণ,জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ের গবেষণা, প্রতিরক্ষামূলক পাহারা,রেডিও টেলিভিশন যোগাযোগ ইত্যাদি অনেক কাজ করা যায়।

চন্দ্রা এতোক্ষণ নীরবে শুনছিল। সে বলল— এই যে প্রথম. দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের রকেটগুলো খসে পড়ে যায়, সেগুলো মানুষের ওপর পড়ে দুর্ঘটনা ঘটায় না ?

আনজুম বললেন— না, এগুলো কোথায়, কখন ল্যান্ডিং করবে তা হিসাব করা আছে। যান্ত্রিক গোলযোগ না দেখা দিলে এগুলো কোনো দুর্ঘটনা ঘটায় না।

এর মাঝে কমলা এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি ভাবলেন কোনো এক্সিডেন্ট হয়েছে কি না। বললেন— কিসের দুর্ঘটনা ?

আনজুম বললেন— না,না,দুর্ঘটনা নয়। স্যাটেলাইট উেক্ষপণে রকেট ল্যান্ডিং এর কথা বলছিলাম।

কমলা হাসলেন— ও আচ্ছা !