ইসলামে পরমতসহিষ্ণুতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান

আমাদের সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও ধর্মের অনুসারী ব্যক্তির মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা প্রদর্শনকে পরমতসহিষ্ণুতা বলে। ইসলামের পরিভাষায় কারও কথায়, কাজে বা আচার-ব্যবহারে কোনোরকম ক্রোধান্বিত বা উত্তেজিত না হয়ে ধৈর্য, সংযম, সমঝোতা ও সহনশীলতার পন্থা অবলম্বন করে স্বীয় কর্তব্য পালন করাই পরমতসহিষ্ণুতা। মানুষের পারস্পরিক আচার-আচরণে, কথাবার্তায় সংযতভাবে মধ্যমপন্থা অবলম্বন ও মনের সংকীর্ণতা বিদূরিত করে উদার মনোভাব ও  শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সমঝোতা ও সহযোগিতার দ্বারা উদ্ভূত সমস্যাবলি নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করায় উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা বিনয় নম্র নিজেদের সালাতে। যারা অসার ক্রিয়াকলাপ বা নিরর্থক কথাবার্তা  থেকে বিরত থাকে।’ (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ১-৩)

বাধা-বিপত্তি, দুঃখ-কষ্ট, হা-হুতাশ ও কান্নাকাটিতে ভারাক্রান্ত না হয়ে সহিষ্ণুতার মাধ্যমে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে এবং বিপদ-আপদে ও বালা-মুসিবতে ধৈর্যধারণপূর্বক আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলতে হবে— হে আল্লাহ! তুমি আমার উপর এমন দুঃখ-কষ্ট চাপিয়ে দিও না, যাতে আমি ধৈর্যচ্যুত হই বরং তুমি আমার উপর দয়া কর। যেমনভাবে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের উপর এমন বোঝা চাপিয়ে দিও না যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬) এভাবে ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করলে আল্লাহ তার উপর খুশি হন এবং তার জীবনে সফলতা আসে।

রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুমহান জীবনচরিত ছিল উদারতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, বিভিন্ন দলমতের সমঝোতা ও পরমতসহিষ্ণুতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জন্মভূমি মক্কাবাসীর ঠাট্টা-বিদ্রূপ, অত্যাচার-নির্যাতন চরমে পৌঁছুলেও তিনি কিছুতেই সহিষ্ণুতা হারাননি। হিজরতের পরে রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা ও তায়িফ বিজয়ের সময় যে অতুলনীয় ক্ষমার আদর্শ প্রদর্শন করেছেন বিশ্বের ইতিহাসে এর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। তার সার্থক ও নির্মল ক্ষমাসুন্দর উদারতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সমঝোতা ও পরমতসহিষ্ণুতার সুমহান চরিত্র বিশ্ববাসীর পথপ্রদর্শক হিসেবে পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ঐতিহাসিক সৈয়দ আমীর আলীর ভাষায়, ‘বিজয়ের মুহূর্ত রাসূলুল্লাহ (স) সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে গেলেন, সমস্ত অত্যাচার ক্ষমা করেন এবং মক্কাবাসীর প্রতি সার্বজনীন ক্ষমা ঘোষণা করেন। কোনো গৃহ লুণ্ঠিত হলো না বা কোনো স্ত্রীলোক অপমানিত হলো না।’

যে সমাজে শান্তিপূর্ণ সমঝোতা ও পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা যত বেশি, সে সমাজে অপরাধপ্রবণতা তত কম। নবী করিম (স) বলেছেন, ‘আল্লাহর অনুগ্রহের মধ্যে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার ক্ষমতাদান সবচেয়ে বেশি মূল্যবান।’ (বুখারি ) ইসলামের আলোকে ধৈর্য, সংযম, উদারতা ও সহিষ্ণুতা মানুষের ঈমানকে পরিপক্ক করে। ঈমানের যতগুলো শাখা-প্রশাখা রয়েছে তার মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা অন্যতম। রাসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করেছেন, ‘ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা ঈমানের অর্ধাংশ।’ (আবু নাঈম) তিনি আরও বলেছেন, ‘সহিষ্ণুতার পুরস্কার জান্নাত।’ (বায়হাকী)

এভাবে ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী যদি সবক্ষেত্রে অপরের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে সহিষ্ণুতার সঙ্গে প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করা যায় তাহলে সমাজ জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা ও ঐক্য-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। নতুন বছরে আমাদের মধ্যে পরমতসহিঞ্চুতা আরও বাড়ুক। ভিন্নমতের প্রতি যেন আমাদের শ্রদ্ধা থাকে। মতে না মিললে যেন আমরা যুক্তি দিয়ে তার জবাব দিই।

lলেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউট অব ল্যাংগুয়েজ স্টাডিজ। প্রফেসর ও এডভাইজার, ইসলামিক স্টাডিজ ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগ, স্কুল অব লিবারেল আর্টস, ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, উত্তরা, ঢাকা