বাসে উপেক্ষিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন

দায়িত্ব পালনকালে ৯১ শতাংশ চালক ও হেলপার ধূমপানে অভ্যস্ত

মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ

রাজধানীর বাসগুলোতে মানা হচ্ছে না তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন। এ বিষয়ে জনগণের দুর্ভোগ চরমে। বিশেষ করে নারী যাত্রীদের অবস্থা করুণ। যাত্রীদের অভিযোগ, বাসচালকের সহকারীরা কিছুটা সংযত থাকলেও বাসের চালক বেপরোয়া। এক জরিপে দেখা যায় যে, ৯১.৩ শতাংশ চালক ও হেলপার সরাসরি বাসে ধূমপান করে থাকেন।

বাসের যাত্রী নাঈমা বলেন, ছেলেরা ধূমপান করে, তারা এই ধোঁয়ার গন্ধ সহ্য করতে পারলেও মেয়েদের এতে খুব কষ্ট হয়। এছাড়া বাচ্চাদের নিয়ে বাসে ওঠার সুযোগই নেই। অন্য যাত্রী আহসান বলেন, মানুষের কোনো না কোনো অসুস্থতা থাকে, কিন্তু সেসব পাবলিক বাসে বা পাবলিক প্লেসে কেউ বোঝার চেষ্টাও করে না। সব অপরাধ যেন নিরীহ মানুষকে সহ্য করে যেতে হবে।

অথচ সরকার ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রণয়ন করেছে। আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী, পাবলিক প্লেস এবং পাবলিক পরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ। আইনের ধারা-৭-এর (ক) অনুযায়ী, পাবলিক প্লেস বা পাবলিক পরিবহনের মালিক/তত্ত্বাবধায়ক/ব্যবস্থাপক তার পাবলিক প্লেস এবং পাবলিক পরিবহনকে ধূমপানমুক্ত রাখবেন। আইনের ধারা-৮ অনুযায়ী, সব পাবলিক প্লেস এবং পাবলিক পরিবহনে সতর্কতামূলক নোটিশ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। এমন আইন থাকার পরও পাবলিক প্লেসে ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান চলছে। 

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে শাস্তি ও জরিমানায় বলা আছে, পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপানের জরিমানা অনধিক ৩০০ টাকা। পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহন ধূমপানমুক্ত রাখতে না পারলে ঐ পাবলিক প্লেসের মালিক/ম্যানেজারের জন্যও অনধিক ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপানমুক্ত নির্দেশনা না থাকলে ঐ পাবলিক প্লেসের মালিক/ম্যানেজারের জন্যও অনধিক ১ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তামাকজাত দ্রব্যের সকল প্রকার বিজ্ঞাপন ও প্রচার-প্রচারণা আইনত নিষিদ্ধ। অমান্যে ১ লাখ টাকা জরিমানা বা তিন মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা উভয়ই হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আইন ভঙ্গ করলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রুট পারমিট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের সচেতনতায় নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে। বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনগুলো বাসচালক ও শ্রমিকদের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন মানাতে বিভিন্ন উপায়ে সচেতন ও উত্সাহিত করতে পারেন। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ফিটনেস প্রদানে ধূমপানমুক্ত রাখার শর্তারোপ করতে হবে। তাহলে পাবলিক পরিবহনে সবাইর জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

‘ঢাকা শহরে পাবলিক পরিবহনে (বাসে) তামাক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রতিপালনের অবস্থা যাচাই’ শীর্ষক জরিপের তথ্যে দেখা গেছে, রাজধানীর শতভাগ পাবলিক পরিবহনে (বাস) তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন মানা হচ্ছে না। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে রাজধানীর ২২টি রুটে ৪১৭টি ননএসি বাসে ক্রসসেকশোনাল জরিপ কার্যটি পরিচালিত হয়। জরিপে দেখা যায় যে, ৯১.৩ শতাংশ চালক ও হেলপার সরাসরি বাসে ধূমপান করে থাকে। ১০০ ভাগ পাবলিক পরিবহনে (বাস) তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসারে ধূমপানমুক্ত সাইনেজ পাওয়া যায়নি। ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের (সিটিএফকে) অর্থায়নে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন এই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করে।

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের ‘হেল্থ ও ওয়াস সেক্টরে’র পরিচালক ইকবাল মাসুদ বলেন, ১৯৯০ সাল থেকে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন তামাক নিয়ন্ত্রণে কাজ করে আসছে। ধূমপানে শুধু নিজের নয় বরং পরোক্ষ স্বাস্থ্য ক্ষতির উল্লেখযোগ্য কারণ। যদি কোনো পাবলিক পরিবহন ধূমপানমুক্ত সাইনেজ স্থাপন না করে থাকে, তাহলে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ যেন পরিবহনের ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান না করে।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, সব পরিবহনে ধূমপানমুক্ত সাইনেজ স্থায়ীভাবে স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।