ড. মো. হুমায়ুন কবীর
নদী নিয়ে দেশে অনেক আলোচনা রয়েছে। বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। নদীর পরিসংখ্যান নিয়ে রয়েছে মতভেদ। কেউ হিসাব দেখান বাংলাদেশে রয়েছে ছোট-বড় মিলে সাত শতাধিক নদী। আবার কেউ কেউ দেখান এ সংখ্যা আরো বেশি। তবে সর্বশেষ সরকারি তথ্যমতে, এ সংখ্যা কমবেশি ২৩০টি। সংখ্যা যা-ই হোক না কেন, এ নদীগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সারাদেশে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে রয়েছে অর্ধশতাধিক নদনদীর সংযোগ। আবার নাফ নদীটি বিভক্ত করেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তকে। এভাবে দেখতে গেলে প্রতি জেলায় একাধিক ছোট-বড় নদী রয়েছে। তাছাড়া নদীর সংখ্যা যদি সাত শতাধিক হয়, সেখানে প্রতি উপজেলাতেও কমপক্ষে একটি নদীর অস্তিত্ব বিদ্যমান।
নদী সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে আগে জানা দরকার নদী আমাদের কী উপকারে আসে। একসময় বাংলাদেশে চলাচলের এবং পণ্য পরিবহনের উল্লেখযোগ্য মাধ্যম ছিল নদীপথ। সেজন্য আজও বাংলাদেশের বড় বড় শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো রয়েছে নদীবন্দরে। তেমন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নদীবন্দরের নাম এখনো গুরুত্বপূর্ণ। ভৈরব বাজার, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঈশ্বরদী, গোয়ালন্দ, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, ঢাকা, রাজশাহী উল্লেখযোগ্য। ব্যবসায়-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে নারায়ণগঞ্জকে সেজন্য বাংলাদেশের ডান্ডি বলা হতো। তবে কালের বিবর্তনে এখন সেসব নদীপথ শুধুই ইতিহাস। এমনও নদীপথ রয়েছে, যেগুলোর আর কোনো চিহ্নই পরিলক্ষিত হয় না।
এখন নদীবন্দর বা নদীপথ যে শুধু বিলীন হয়ে গেছে তা-ই নয়, সেগুলো বিলীন করার পেছনে অনেকাংশে আমরাই দায়ী। দখল, দূষণ নদীর নিত্যনৈমিত্তিক কশাঘাত। নদীর কোনো ব্যক্তিমালিকানা থাকে না। সেগুলো সরকারের প্রাকৃতিক সম্পত্তি। এর রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা সবকিছুর জন্যই সরকারের আলাদা আলাদা কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কিন্তু এসব কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়ত ফাঁকি দিয়ে সেসব প্রাকৃতিক সম্পদ গ্রাস করে চলেছে একশ্রেণির মুনাফালোভী অবিচারি ও অবিবেচক মানুষ। তারা নদীর জেগে ওঠা চর কিংবা নদীর ধার বা পাড় ভরাট করে স্থাপনা তৈরি করে নদী দখল করে নিচ্ছে। আবার নদীর ধারে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি হচ্ছে না কলকারখানা। এতে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ।
একদিকে নদীর চারপাশে দখল ও মানুষের সৃষ্টি করা বিভিন্ন কার্যকলাপের ফলে নদী ভরাট হয়ে তা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নদীর আশপাশে অস্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবিরোধী বিভিন্ন কলকারখানা তৈরি করে নদীকে নিয়মিত দূষিত করে চলেছে। আগে সেগুলো আমরা দেখতাম বড় বড় শহরে কিংবা বাণিজ্যিক এলাকাতেই নদীদূষণ সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এমন দূষণের মতো পরিস্থিতি এখন গ্রামের সেই আমাদের ছোট্ট নদীটি পর্যন্ত বিস্তৃত। নদী দখল-দূষণে কী পরিমাণে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বা হচ্ছে তা আমরা এ করোনাকালে একটু হলেও বুঝতে পেরেছি। কারণ, এ করোনাকালের মহামারি বা ক্ষতির ভেতর দিয়েও আমাদেরকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দিচ্ছে। অর্থাত্ যখন সারাদেশে লকডাউন অবস্থা চলছিল, দেশের সব রাস্তাঘাট, গাড়িঘোড়া, শিল্প-কলকারখানা বন্ধ ছিল। সে সময়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের অনেক উন্নতি সাধিত হতে দেখেছি। দেখেছি নদীদূষণ বন্ধ থেকে পরিষ্কার ঝলমলে পানির স্রোত।
উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে বর্তমানে আমরা যে এলাকায় বসবাস করি, সেখানকার কথাই ধরা যেতে পারে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ এবং ঢাকার আশপাশের এলাকার বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ নদনদীর মধ্যে রয়েছে মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা, নরসুন্দা, কাঞ্চন, তুরাগ, সুতী ইত্যাদি। এর মধ্যে ত্রিশাল, ভালুকা, গফরগাঁও, শ্রীপুর, কাপাসিয়া, পাকুন্দিয়া, হোসেনপুর—এসব এলাকায় ছোট ছোট কিছু নদী রয়েছে। এগুলো আদিকাল থেকে স্বমহিমায় বহমান ছিল। কিন্তু সম্প্রতি নাগরিক উন্নয়নের ডামাডোলে এসব নদীও আজ ব্যাপকভাবে দখল ও দূষণের শিকার। কারণ আগেই বলেছি, দেশের নতুন নতুন এলাকা এখন শিল্প বাণিজ্যের আওতায় আসায় সেগুলো ব্যাপক প্রভাব ফেলছে গ্রামীণ ছোট ছোট নদনদীর ওপর। কাজেই দখল-দূষণ বন্ধে প্রয়োজন আগেভাগেই সেসব নদী সুরক্ষার জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করা। এটি কোনো কঠিন কাজ নয়। দেশের উন্নয়ন হবে সেটি সব নাগরিকের মতো আমরাও অবশ্যই চাই। কিন্তু সেটি করতে গেলে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে নদীকে ধ্বংস করে কেন? নদী থেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখেও তো শিল্পবিপ্লব করা সম্ভব। তাছাড়া যদি করতেই হয়, তবে সেটি পরিবেশসম্মতভাবে নদীকে বাঁচিয়েও করা যেতে পারে। অন্যথায় দেখা যাবে গ্রামের মানুষ এর বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে। তেমনি একটি উদ্যোগের উদাহরণ সম্প্রতি দেখেছি গণমাধ্যমে। ময়মনসিংহের গফরগাঁও, ত্রিশাল, ভালুকা গাজীপুরের শ্রীপুর এবং কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুরের একদল তরুণ পরিবেশকর্মী ‘সুতী নদী সুরক্ষা’ নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। তারা কাজ শুরু করেছেন ‘সুতী সুরক্ষা পরিষদ’ নামে।
কাজেই আগেই বলেছি, এ করোনাকালে দখল-দূষণ বন্ধ থাকার কারণে যেভাবে নদীর পরিষ্কার পানির স্রোত দেখা যাচ্ছে, এমন অবস্থা সব সময় ধরে রাখতে পারলেই নদীর দূষণ রোধ করা সম্ভব। অর্থাত্ করোনা না হলে কোনো দিনও হয়তো এমনভাবে দীর্ঘদিন শিল্পকলকারখানা বন্ধ থাকত না। তখন নদীর এমন ভালো অবস্থা কখনো দেখা সম্ভব হতো না। তাই করোনাকাল থেকে নদনদী সুরক্ষার কৌশল শিক্ষা নিতে হবে। চালিয়ে যেতে হবে দেশব্যাপী এবং বছর জুড়ে।
n লেখক :কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়