মুমতা হেনা মীম
একটি জাতির উন্নয়নের চাবিকাঠি যাদের হাতে তারা হলো এদেশের কিশোর-তরুণ। বর্তমানের শিশু-কিশোররাই আগামী দিনের ভবিষ্যত্। একটি দেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিতকরণের জন্য সে দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের মৌলিক চাহিদা তথা—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিত্সা এবং সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তার পাশাপাশি আরো কিছু বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো শিশু-কিশোরদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতনতা অবলম্বন, সামাজিক পরিবেশের উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং দেশপ্রেম জাগ্রতকরণ।
ব্যাপারটি দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের দেশের শিশু-কিশোরদের একটি বিরাট অংশ ভুল পথে চারণ করছে। হয়ে পড়ছে পথভ্রষ্ট। নিজের ক্যারিশমা জাহির করতে, নিজেকে হিরো প্রমাণ করতে কখনো হাস্যরসাত্মক কখনো বা অপরাধপ্রবণ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। কখনো করে ফেলছে ছোট-বড় নানা অপরাধ। ছোট-খাটো ব্যাপার নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করে তার থেকে ঘটিয়ে ফেলছে মারাত্মক অপরাধ। উচ্ছন্নে যাওয়া বন্ধু-বান্ধবের কুসঙ্গ আর অবাধ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারে বিকৃত হয়ে যাচ্ছে মস্তিষ্ক, অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিপথে চলে যাচ্ছে কিশোররা। নিজেকে ক্ষমতাশালী প্রমাণ করার জন্য প্রকাশ্যে ছিনতাই-মারধর-ধর্ষণ এমনকি হত্যা করতে পিছপা হচ্ছে না তারা। গত ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর জামালখান এলাকায় প্রকাশ্যে কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদনান ইশফারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল পাঁচ কিশোর। এমন অনেক ঘটনা অহরহ ঘটছে, যা দৈনিক পত্রিকায় রোজ চোখে পড়ে। বর্তমানে কিশোররা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে অশ্লীল কর্মকাণ্ড, ধূমপান ও মাদক গ্রহণ, ইভটিজিং, টিকটক নামের সস্তা বিনোদন মাধ্যম আর সোশ্যাল মিডিয়ায় অশালীন অঙ্গভঙ্গি ও ভাষা ব্যবহার করে নিজেদের হিরোইজম প্রকাশ করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এসব গর্হিত কাজ যারা করছে, তাদের অধিকাংশই টিনেজার। যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে।
যারা দেশের বর্তমান ভবিষ্যত্ কান্ডারি, তাদের এ করুণ অবস্থা সত্যিই উদ্বেগজনক। দারিদ্র্য, বাবা-মায়ের সঠিক পরিচর্যার অভাব, বাবা-মায়ের দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদ-ভাঙনসহ আরো নানা কারণ কিশোর-তরুণদের বিপথগামী করে তুলছে। পরিবারের বন্ধন, মূল্যবোধ সবকিছু যেন ভেঙে যাচ্ছে এই সময়ে এসে। ব্রোকেন ফ্যামিলির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে দিনদিন। আর এসবের ধাক্কাটা গিয়ে লাগছে শিশু-কিশোরদের ওপর। ফলে তারা মনোবল হারিয়ে বেছে নিচ্ছে কুসঙ্গ, সর্বনাশা মাদক। বাংলাদেশে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা ক্ষতিকর মাদকে আসক্ত হয়ে প্রতিনিয়তই সুস্থ জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বহু তরুণ, কিশোর-কিশোরী।
কিশোরদের এই অবক্ষয়ের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে রয়েছে অপসংস্কৃতি চর্চা। অপসংস্কৃতি তারুণ্যের সুন্দর বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবক্ষয় আর মাদক নেশার করাল গ্রাসে নিমজ্জমান তারুণ্য অনিশ্চিত ভবিষ্যতেরই প্রতিচ্ছবি। পাশ্চাত্যের উদ্ভট পোশাক-আশাকে তরুণ সমাজ কথাবার্তায়, আচার-আচরণেও হারাতে বসেছে বাঙালির ঐতিহ্য। নিজের স্বকীয়তা, মূল্যবোধ আর বিবেক বিসর্জন দিয়ে অপসংস্কৃতির এ বিলাসী স্রোতেই অবগাহন করছে আজকের তরুণ-তরুণীরা। যে বাঙালি তরুণ সমাজের রয়েছে অন্যায় আর অনৈতিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের অসামান্য ঐতিহ্য, অপসংস্কৃতির কবলে পড়ে সেই তরুণ সমাজই আজ অনৈতিকতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে। সুন্দর জীবনযাপনের মধ্যেই সংস্কৃতির মহত্ত্ব। অসুন্দরভাবে বেঁচে থাকা অপসংস্কৃতির নামান্তর। বিশ্বের সংস্কৃতির ভালো দিক গ্রহণ ও মন্দ দিক বর্জন করেই আমাদের সংস্কৃতিকে জাগ্রত করতে হবে। অপসংস্কৃতির করাল গ্রাস থেকে এ সমাজকে মুক্ত করতে হবে।
কিশোর সমাজকে এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দেশের জনগণকে হতে হবে আরো সচেতন। সৃষ্টিশীল কাজে শিশুদের উত্সাহিত করতে হবে। এ দেশের সংস্কৃতি, জাতীয় ঐতিহ্য, ধর্মীয় চেতনা সৃষ্টি করতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে সঠিক শিক্ষাদান ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতকরণই বর্তমান কিশোর সমাজকে ব্যাধিমুক্ত করতে পারবে। সৃষ্টি করতে পারবে বাঙালির আজন্ম লালিত স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়