সানজানা হোসেন অন্তরা
বর্তমানে বাংলাদেশেও উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বেড়েই চলছে এবং এদের বেশির ভাগ ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া শিক্ষার্থী। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত অধিক জনসংখ্যার পাশাপাশি বেকারত্ব একটি প্রধান সমস্যা হয়ে রয়ে গেছে। নতুন করে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার বৃদ্ধি একটা চিন্তার বিষয় হয়ে দেখা দিচ্ছে। উচ্চশিক্ষা এখন আর কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। তাই বহু শিক্ষার্থী নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে এবং ‘চাকরি করব’ এই কথার চেয়ে ‘চাকরি দেব’ এ কথায় বিশ্বাসী হয়ে উঠছে।
এতো আশার আলো থাকার পরেও প্রতিবছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে এতে বাংলাদেশের বেকারত্বের হার দিনকে দিন বাড়ছেই। ২০১৯-এ ILO (আইএলও) থেকে প্রকাশিত ‘এশিয়া প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান, নিষ্ক্রিয় তরুণের হার ইত্যাদি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং এই প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হারে ২য় সর্বোচ্চ বাংলাদেশ (১০ দশমিক ০৭ শতাংশ)।
এত শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হবার প্রবল আগ্রহ থাকার পরও বাংলাদেশের এ অবস্থার পিছনে অন্যতম ও প্রধান কারণ হলো উদ্যোক্তাদের অবমূল্যায়ন। এ দেশে উদ্যোক্তাদের সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না। যখন কেউ আত্মসম্মানের সঙ্গে নিজ উদ্যোগে কিছু করতে চায়, আশপাশের মানুষ ভ্রূ কুঁচকিয়ে এমন ভাবে দেখে তাদের, তারা তাদের উত্সাহ হারিয়ে ফেলে, অনেকে আবার উদ্যোক্তাদের কাজকে কোনো পেশার অন্তর্ভুক্ত বলে মনেই করেন না। আমাদের পরিবার, সমাজ এখনো চিন্তাভাবনায় অনেক পিছিয়ে, তারা শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা একমাত্র সরকারি চাকরিতেই খুঁজে পায়। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে চাকরির বাজার যেন এক সোনার হরিণ, সেখানে একটা মনমতো চাকরি প্রায় অসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় নিজের ও দেশের উন্নতির কথা ভেবে কেউ যখন নিজে কিছু করতে চায় তা আমাদের সমাজ সময় নষ্ট হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিগণ এক জন উদ্যোক্তা হয়েই কাজ শুরু করে সফল ব্যবসায়ীতে রূপান্তর করেছেন নিজের ভাগ্যকে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য উদ্যোক্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন অতীব জরুরি। দেশের অনেক শিক্ষিত তরুণ ফ্রিল্যান্সার বা উদ্যোক্তা হিসেবে ভালো আয় করেন কিন্তু সামাজিক স্বীকৃতি নেই। ২৫ আগস্ট ২০২০, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি কীভাবে দেওয়া যায় তা ভাবতে হবে।’
আমাদের বর্তমান সরকার উদ্যোক্তাদের নিয়ে এরই মধ্যে ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছেন, আশা করছি অতিদ্রুত বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যা উদ্যোক্তাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে সাহায্য করবে। তবে সরকারের একার পক্ষে কিছুই সম্ভব না, দেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের দায়িত্ব দেশকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা এবং সেজন্য নিজেদের মনোভাব আগে পরিবর্তন করতে হবে। উদ্যোক্তাদের উত্সাহ দিয়ে তাদের পাশে থাকা, তাদের কাজকে যথাযথ মূল্যায়ন করা, তাদের পেশাকে সম্মান করা।
একজন উদ্যোক্তা যখন নিজের চেষ্টা, শ্রম, মেধা এবং অন্যদের অনুপ্রেরণায় নিজেকে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, তখন সে নিজে আরো হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারবে। এরকম হাজার উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ যদি সফল হয়, তবে বাংলাদেশের বেকারত্বের হার যেমন কমবে, ঠিক একইভাবে অনেক কর্মহীন মানুষ আত্মসম্মানের সঙ্গে আত্মনির্ভরশীল হয়ে বাঁচতে পারবে। আমাদের দেশের নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে তবুও তাদের মধ্যে বর্তমানে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবল আগ্রহ, অনেক গৃহিণীও নিজস্ব দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছে, যা তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করছে, সমাজে নিজের একটা অবস্থা তৈরি করছে।
অধিক জনসংখ্যার এ অভিশাপ থেকে দেশকে তখনই রক্ষা করা সম্ভব যখন এই বিপুল জনসংখ্যার কাজের ব্যবস্থা করে, আত্মনির্ভরশীল করে জনসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। আর সে জন্য উদ্যোক্তাদের উদ্যোগকে সফল করে নতুন নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, উত্সাহ দিতে হবে, যেন তারা আরো উত্সাহের সঙ্গে কাজ করে, প্রতিষ্ঠিত হতে পারে নিজ উদ্যোগে এবং অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারে। তবেই এদেশের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, তবেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।