গ্যাসের অবৈধ সংযোগে বিপদ, না নিলে আপদ!

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে একটি দোতলা ভবন ছিল আবদুল আলিমের (ছদ্মনাম)। ঐ ভবনে গ্যাসের পাঁচটি বৈধ সংযোগ ছিল। গত বছর ভবনটি ছয়তলা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। এরপর থেকেই তিতাস গ্যাসের কর্মী কিংবা ঠিকাদার পরিচয় দিয়ে কয়েক জন তার বাসায় এবং দোকানে আসা যাওয়া শুরু করে। দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সংযোগ নেবেন না জানিয়ে দেওয়ার পরও তারা কয়েকবার ঐ বাড়িতে ‘অবৈধ’ লাইন রয়েছে এমন অভিযোগ এনে হয়রানিমূলক ‘অভিযান’ পরিচালনা করেন। এক পর্যায়ে তারা ঐ ভবনের বৈধ রাইজারও তুলে নিয়ে যায়। পরে অনেক দেনদরবার করে তা ছাড়িয়ে আনতে হয়। যে হয়রানি পোহাতে হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

শেওড়াপাড়ায় নতুন নির্মিত একটি ভবনে ফ্ল্যাট কিনেছেন সাব্বির হোসেন (ছদ্মনাম)। ২৪ ফ্ল্যাটের ঐ ভবনটিতে গ্যাসের পাইপলাইন টেনে রেখেছে ডেভেলপার কোম্পানি। বৈধতা নেই বলে সংযোগ নেওয়া হয়নি। এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছে তার পরিবার। কিন্তু কিছু দিন পরপরই ‘তিতাসের লোক’ পরিচয় দিয়ে কয়েক জন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংযোগ নিতে বলেন। তাদের প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানালে বাসায় গ্যাসের অবৈধ লাইন রয়েছে এমন কথা বলে জরিমানার হুমকি দেয়।

এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশে আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ। কিন্তু অবৈধভাবে এ সংযোগ দেওয়া-নেওয়া থেমে নেই। অবৈধ সংযোগ নিয়ে অনেকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে উপকৃত হলেও গোটা গ্যাস বিতরণ লাইনকে বিপজ্জনক করে ফেলেছে। আর যারা এ লাইন নিতে চান না তাদের জন্য ‘আপদ’ হিসেবে চেপে বসেছে তিতাস গ্যাসের একশ্রেণির কর্মী ও দালাল চক্র। আর তাতে প্রশ্রয় দিচ্ছে একাধিক প্রভাবশালী মহল। কেউ নতুন বাড়ি তৈরি বা সম্প্রসারণ করলেই এই অশুভ চক্রটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে বৈধ গ্যাস সংযোগ পাওয়া যাবে এমন আশায় যারা ভবনে গ্যাসের পাইপলাইন আগাম টেনে রাখেন তাদেরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এরা। বৈধ না হলে সংযোগ নেওয়া হবে না এমন কথা জানালে চক্রগুলো নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকে। আবার ডেভেলপার কোম্পানিগুলোকেও নতুন ভবনে সংযোগ দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেয় তারা। এদের মধ্যে কাউকে সংযোগ দিতে পারে। কাউকে পারে না। কিন্তু ফ্ল্যাট মালিকদের কাছ থেকে ঠিকই আগাম টাকা আদায় করে নেয়।

গ্যাসের অবৈধ সংযোগের কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে চলছে। ফায়ার সার্ভিসের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সংঘটিত ২৪ হাজার ৭৪টি অগ্নি দুর্ঘটনার মধ্যে ৪ হাজার ৪২৮টি সংঘটিত হয়েছে গ্যাসের পাইপলাইনের ছিদ্র থেকে। ২০১৬ সালে পাইপলাইনের ছিদ্র থেকে ৩ হাজার ৪৪৭টি আগুন দুর্ঘটনা-বিস্ফোরণ ঘটে। এ ছিদ্রগুলোর ২৫ শতাংশ তৈরি হয়েছে অবৈধ লাইন তৈরির কারণে। এসব দুর্ঘটনায় হতাহত হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ।

পেট্রোবাংলা এবং তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (টিজিটিডিসিএল) সূত্রে জানা যায়, ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে গ্যাস সরবরাহকারী তিতাস গ্যাস কোম্পানির গ্রাহক সংখ্যা ২০০৯ সালে ছিল ১৪ লাখ ৫৮ হাজার ৭৪৩। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৩৭। ঐ বছরই সরকার আবাসিক খাতে নতুন সংযোগ বন্ধ করে। সীমিত করে শিল্পে সংযোগও। মূলত ২০০৯ সাল থেকেই গ্যাসের অবৈধ লাইন তৈরি ও সংযোগ শুরু হয়। এক পর্যায়ে ২০১৪ সালে কিছু সময়ের জন্য পুনরায় নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। তিতাস গ্যাসের ঐ বছরের হিসেব মতে তখন কোম্পানির আওতাভুক্ত এলাকায় ১ লাখ ৬৫ হাজার অবৈধ গ্রাহক ছিল। এর মধ্যে অনেকেই গ্যাস সংযোগ বৈধ করেছেন, আবার অনেকেই করেননি।

তিতাস গ্যাসের অপারেশন ও ভিজিল্যান্স টিমের কয়েক জন সদস্য জানান, অবৈধ সংযোগের জন্য তিতাসের অনেক কর্মী দায়ী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. আল মামুন বলেন, এমন কিছু পর্যবেক্ষণ করেছি আমরা। ডেভেলপার কোম্পানিগুলোর সমিতি রিহ্যাব এবং কয়েকটি কোম্পানিকেও আমরা এ বিষয়ে শিগিগরই চিঠি দেব। তিনি বলেন, গ্রাহকদের চাহিদাকে আশ্রয় করেই মূলত অবৈধ সংযোগগুলো হচ্ছে। আবার অনেক গ্রাহক না চাইলেও তাদেরকে অবৈধ গ্যাসের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তিতাসের অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ ও পাইপলাইন অপসারণ কার্যক্রম সংক্রান্ত মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকাসহ ছয়টি জেলায় এর বিতরণ এলাকায় এখনো ২৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ অবৈধ লাইন রয়েছে। তিতাসের একাধিক প্রকৌশলী কর্মকর্তা জানান, কোম্পানির হিসাবের বাইরেও অবৈধ সংযোগ রয়েছে। জনসংখ্যা ও গ্রাহক ঘনত্ব বিবেচনায় এ অবৈধ গ্রাহক সংখ্যা ১০ লাখের কম হবে না।