তিতাস :বাংলাদেশের দুর্নীতির মডেল

 ‘তিতাস একটি নদীর নাম’—অদ্বৈত মল্লবর্মণের বহুল ‘নন্দিত’ একটি আখ্যান। এই তিতাসই আরেক দিক হইতে বহুল ‘নিন্দিত’। আমরা বলিতেছি ‘তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড’-এর কথা। তাহাদের সরবরাহকৃত সংযোগের পাইপলাইনে লিকেজ, অবৈধভাবে সংযোগ দেওয়া বা অনিয়ম-দুর্নীতির কথা নূতন নহে। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জে মসজিদে তিতাসের লাইন বিস্ফোরণের পর ইহা লইয়া ব্যাপক গুঞ্জন শুরু হইয়াছে মাত্র। পত্রিকান্তরে এখন তিতাসের সমস্যা লইয়া কলমের ফল্গুধারা বহিয়া যাইতেছে। জানা গিয়াছে, ঢাকা শহরে ৭০ হাজার পয়েন্ট হইতে গ্যাস লিক হয়। বলা হইতেছে, তিতাসের মূল সমস্যা হইতেছে তাহারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের প্রতি অধিক আগ্রহী। তিতাসের অবৈধ সংযোগ, পাইপলাইন অবৈধভাবে বসানো, প্রিপেইড মিটার না লাগানো, গ্যাস চুরি—এইগুলি নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসির থাকিলেও প্রতিষ্ঠানটি যেন ইচ্ছা করিয়াই ‘অকেজো’ হইয়া রহিয়াছে। অথচ, কাগজে কলমে বিইআরসি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। বিইআরসি কদাচিত্ কোনো দুর্নীতি-অনিয়মের তদন্ত করিয়া খুব অধিক হইলে পিওন-দারোয়ান বা মাঠপর্যায়ের দুই-চার জনকে কথিত অপরাধের শাস্তি প্রদান করিয়া বুঝাইতে চাহে যে, তাহারা দুর্নীতি-অনিয়মের প্রতিকার করিতে আন্তরিক। কিন্তু উচ্ছেদের কিছুদিন পরই পুনরায় নেটওয়ার্ক বসিয়া যায়। 

তিতাস লইয়া এতখানি বলিবার কারণ হইল, বাংলাদেশে দুর্নীতির চিত্রটি কেমন—তাহার একটি মডেল এই প্রতিষ্ঠান। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি বন্ধে ইতিপূর্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ১০১টি খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করিয়াছে। অর্থাত্ তিতাস বাদ দিয়াও আমরা আরো শত খাতের কথা বলিতে পারি, যেইখানে দুর্নীতি একরকম সিস্টেমের মধ্যে ঢুকিয়া গিয়াছে। অবস্থা এমন দাঁড়াইয়াছে যে, অনেকে বলিয়া থাকেন, সরকারি অধিকাংশ খাতে যেই সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী রহিয়াছেন, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, তাহাদের অফিসে কেবল একটি ‘ড্রয়ার’ পাইলেও আর কিছু লাগে না। অর্থাত্ মাসে মাসে বেতনের প্রয়োজন পড়ে না। রাশিয়ান একটি রসাত্মক কাহিনি এই ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। রুশ কৌতুকে বলা হইয়াছে, একবার এক ব্যক্তি পুলিশে চাকুরি পাইবার তিন মাস পরও বেতন উত্তোলন করেন নাই। ব্যাংক হইতে যখন ঐ ব্যক্তিকে বলা হইল, তাহার বেতন জমা হইতেছে, তখন সেই নূতন চাকুরি পাওয়া ব্যক্তি অবাক হইয়া বলিলেন—‘আমাকে বেতনও দেওয়া হইতেছে বুঝি! আমি তো ভাবিলাম, পুলিশের চাকুরিতে যোগদানের সময় একটি পিস্তল দিয়া বুঝাইয়া দেওয়া হইল—এই দিয়া করিয়া খাও।’

বাংলাদেশে সিস্টেমের মধ্যে দুর্নীতি-অনিয়ম প্রোথিত করিয়া যেই পরিমাণ অর্থের প্রবাহ ঘটে, অনেকের মতে, তাহা আমাদের বাজেটের চাইতেও অধিক। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, ইহা দেশের সুনীতির সার্বিক ভারসাম্য নষ্ট করিয়া দেয়। অথচ পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ রহিয়াছে, যেইখানে শিক্ষা ও সভ্যতার বোধ অধিক বিধায় নাগরিকগণ নিজেদের সুনীতির দায়িত্ব সম্পর্কে কখনো বিস্মৃত হন না। তাহাদের শিক্ষা ও বিবেকই তাহাদের আইনরক্ষক। দোকানে কেহ না থাকিলেও তাহারা দ্রব্য লইয়া যথোচিত মূল্য ফাঁকা কাউন্টারেই রাখিয়া আসেন। আর সেই সংস্কৃতির শিক্ষা পরিবার ও সমাজ হইতেই মানুষ পাইয়া থাকে। জাতি হিসাবে আমাদের দৈন্য ঘুচাইতে হইলে সততার সংস্কৃতিকে জাগাইয়া তুলিতে হইবে।