সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত
‘রবীন্দ্রনাথ কি শান্তিনিকেতনে বহির্গত? প্রথম লাইন দেখেই বাংলাদেশের পাঠক চমকে উঠবেন। আবার কোনো কোনো পাঠক বলে উঠবেন ছি ছি—এত ঔদ্ধত্য। না শিকি ভাগ শিক্ষিত। না মূর্খ। যা-ই হোক—যেভাবে এই মন্তব্য করুন তাদের জন্য ঐ উক্তিটি রেকর্ড রাখার জন্য। আর এই উক্তি প্রকাশ্যে করেছেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বর্তমান উপাচার্য বিদ্যুত্ চক্রবর্তী। বিদ্যুত্ বাবু ইতিহাস ছাত্রজীবন থেকে আরএসএস-এর ছাত্রসংগঠন বিদ্যার্থী পরিষদ। গত কয়েক মাস ধরে এই বিতর্কের ঢেউ পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন বিশ্বভারতী এবং রবীন্দ্রনাথের অপমানের ঢেউ বিশ্বের আনাচে কানাচে—সর্বত্র। চীনা-জাপান থেকে শুরু করে স্বয়ং ট্রাম্পের দেশ আমেরিকায়ও।
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ তার জীবদ্দশায় শুরু করেছিলেন পৌষমেলা এবং বসন্ত উত্সব। এ দুটি তার প্রিয় উত্সব ছিল। বর্তমান উপাচার্য এবং তার বন্ধু আর এক আরএসএস নেতা স্বপন দাশগুপ্ত হঠাত্ স্থির করেন ঐ দুটি উত্সবের জায়গা (মাঠ) পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হবে। তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। নেপথ্যে কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে শিক্ষাবিদরা কেউ কেউ মনে করেন, পাঁচিলের কাজও শুরু হয়। ঠিকাদার ডেকে পাঁচিলের কাজ শুরু হলে কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদ এবং বাম-সমর্থিত ছাত্র ফেডারেশনের ছাত্রছাত্রীরা পাঁচিলের যে অংশের কাজ হয়ে গিয়েছিল তা ভেঙে দেয়। গোলমালের সূত্রপাত এখানেই। কিন্তু এই দুটি ছাত্র ইউনিয়নের পাশে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকা শাসকদলে টু শব্দও করেনি। পশ্চিমবঙ্গে যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে এইসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এবং বিজ্ঞজনেরা চুপ। অপরদিকে বিদ্যুত্ চক্রবর্তী তার মন্তব্যে অনড়। তার ব্যাখ্যা হলো রবীন্দ্রনাথ কলকাতার জোড়াখালের বাসিন্দা। জন্ম জোড়াখালেতে। সুতরাং তিনি বিশ্বভারতীতে বহির্গত।
রবীন্দ্রনাথের সময় থেকে উন্মুক্ত ছিল শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লির পৌষমেলার মাঠ। উপাচার্য ইতিপূর্বে শান্তিনিকেতনে রাস্তার দিকে গেট বসিয়ে মাঠে প্রবেশের পথ অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। পৌষমেলার মাঠে প্রবেশের আরো একটি পথ রয়েছে—শান্তিনিকেতন সড়কসংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পশু হাসপাতাল এবং অগ্নিনির্বাপণ দপ্তরের দিকে। পাশেই শান্তিনিকেতন থানা। এদিক দিয়েও এদিকেও শান্তিনিকেতনের পৌষমেলার মাঠে যাওয়া যায়। ইতিপূর্বে বীরভূমের জেলা পরিষদ অধীনে থাকা উন্মুক্ত ডাকবাংলো মাঠকে পাঁচিল দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। এর ফলে শান্তিনিকেতনের পূর্ব পৌষমেলা মাঠের ওপরে মানুষের নির্ভরতা বেড়েছে। আরো অধিক মাত্রা। সব মাঠ ঘিরে দেওয়ার ফলে আটকে গিয়েছে নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের বাড়িও। মোদি নিজে অর্মত্য সেনকে পছন্দ করেন না। ড. মনমোহন সিংহের রাজত্বের সময় অমর্ত্য সেনকে গয়ায় বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান করা হয়েছিল। আর্থিক সাহায্য দিচ্ছিল জাপান সরকার। ২০১৪ সালে মোদি আমর্ত্য সেনকে বরখাস্ত করেন। জাপান সরকার আর্থিক সাহায্যও বন্ধ করে। এ আর এক ইতিহাস।
পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ শিক্ষাবিদরা অনেকে বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাত্কারে বলছেন—যারা মনে করে বিশ্বকবি তার তৈরি করা শান্তিনিকেতনে তিনি বহিরাগত—তারা হয় মূর্খ, আর না হয়। আরএসএস-এর তৈরি সিলেবাস পড়ানোর জন্য রবীন্দ্রনাথের চালু করা শিক্ষানীতি বদল করবে। কারণ গুরুদেব ছিলেন জাতপাতের ঊর্ধ্বে। বাংলাদেশের বহু ছাত্রছাত্রীও বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করেন। তাই তারা তলে তলে তৈরি হচ্ছে হিন্দুত্ববাদ চালু করতে। মোদি সরকার ২০২২ থেকে সারা দেশে সাধারণ সিলেবাসের পরিবর্তন করার কথা ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে।
পাঠকের জ্ঞাতার্থে এখানে আরো উল্লেখ করা জরুরি প্রয়োজন। ভারতের বর্তমান শাসকদলের প্রধানমন্ত্রী থেকে আরএসএস-এর প্রধান মোহন ভগবত এবং মান্দ্রিরা সবাই আরএসএস-এর স্কুলকলেজ থেকে পড়াশোনা করেছেন। মোটামুটি বলা যায়, মাদ্রাসাশিক্ষার ধাঁচে বিদ্যুত্ চক্রবর্তীরও স্কুল ছিল আরএসএস-এর।
বিশ্বভারতীয় বর্তমান কর্তৃপক্ষ এবার পূর্বভারতীর পৌষমেলার মাঠকে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দেওয়ার কাজ ১৫ আগস্ট থেকে শুরু করেছে। শুধু ধর্মনিরপেক্ষ ছাত্রছাত্রীরা নয়—ঐ এলাকায় তার প্রতিবাদে নেমে পড়েছে বোলপুর ব্যবসায়ী মহল। তাদের বক্তব্য, রবীন্দ্রনাথের আমল থেকে কয়েক প্রজন্ম ধরে রুটি-রুজি চালাতেন। আগস্ট মাস থেকে এই এলাকায় সব শ্রেণির মানুষ পথে নেমেছে। পাঁচিল দেওয়ার পক্ষে এবং রবীন্দ্রনাথ বহির্গত—এই স্লোগান নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছে বিজেপির কর্মী ও সমর্থকরা। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ গোটা বীরভূম ধরে চষে বেড়াচ্ছেন। মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছে পাঁচিল দেওয়ার পক্ষে। এবং রবীন্দ্রনাথ বাইরের লোক বলে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। মমতা সরকারও নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে।
সদ্যনিযুক্ত পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সংসদ অধীর চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে এক চিঠি দিয়ে সতর্ক করে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করে একসময় পাকিস্তানের সামরিক ডিকটেটর জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। পূর্ববাংলার বাঙালিরা রক্ত দিয়ে তা রুখেছে। পাকিস্তান ভেঙে গিয়েছে। তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন—সতর্ক হোন। আপনার চ্যালাদের বলুন, তাদের এই বজ্জাতি আমরা মেনে নেব না। সিপিআরএম-এর পলিব্যুরোর সদস্য মহম্মদ সেলিম স্মরণ করিয়ে দেন—দেশের সংবিধান রচনার সময় নেহরু যখন গুরুদেবকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনের বিল আনেন তখন বিজেপি বা জনসংঘের জন্ম হয়নি। আরএসএস-এর শাখা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দু-এক জন সদস্য বিশ্বভারতী সরকার হাতে নেওয়ায় আপত্তি করেন; কিন্তু তা ধোপে টেকেনি। বিশ্বভারতী ভারত সরকার হাতে নেওয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তথা আচার্য হিসাবে ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ একাধিকবার রিপোর্ট করেছি। প্রতিবারই আচার্য তার ভাষণে উল্লেখ করেন, বিশ্বভারতী আর্থিক সংকটের সময় জওহরলাল নেহরুকে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ডেকে পাঠিয়ে তার আর্থিক সংকটের কথা বলতেন। এবং নেহরু তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত সরকার সব দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। তা-ই করেছিলেন। বিশ্বভারতীয় নিয়ম অনুযায়ী যিনিই দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন তিনিই হবেন আচার্য। কাজ চালানোর জন্য একজন উপাচার্য নিয়োগ করা হবে। নরেন্দ্র মোদি বর্তমানে আচার্য। আর উপাচার্য হলেন একজন সংঘ পরিবারের সদস্য। এটাই দুর্ভাগ্য।
n লেখক :ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক