আবেদনের দুই বছর পরও মিলছে না বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতা

অবসরের পর বেশি ভোগান্তিতে পড়েন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। অবসরের পর সব ধরনের বেতনভাতা বন্ধ হয়ে যায়, এ কারণে শুরু হয় অর্থকষ্ট। কিন্তু শিক্ষকদের এই অর্থকষ্ট মেটাতে প্রতিষ্ঠা করা ‘অবসর সুবিধা বোর্ড’ ও ‘কল্যাণ ট্রাস্টে’র অর্থ পেতে অপেক্ষা করতে হয় দুই বছরের বেশি সময়। এ কারণে শিক্ষকদের অন্তহীন দুর্দশায় পড়তে হয়।

শিক্ষকরা বলছেন, চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর নানামুখী অর্থকষ্টে পড়তে হয়। অবসরের দিন ফুলের তোড়া ছাড়া আর কিছুই জোটে না স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। তাই অপেক্ষা করি অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ফান্ডের জন্য।

আজিজুল ইসলাম নামে এক শিক্ষক বলেন, দুই বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছি। ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর অর্থকষ্টে ভুগছি। নিজের কোনো আয় না থাকায় বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে ধার করে চলছি। আর পারছি না।

সালমান নামে এক শিক্ষক জানান, অপেক্ষার পালা যেন শেষ হয় না। অবসরে যাওয়ার পর সন্তানকে নিয়ে বিপাকে পড়েছি। সন্তানের লেখাপড়া শেষ না হওয়ায় প্রতি মাসে তার পেছনে এখনো ব্যয় করতে হয়।              তিনি প্রশ্ন রাখেন, কোনো টাকা-পয়সা না থাকলে কীভাবে ব্যয় করব। এমন চিত্র কয়েক হাজার শিক্ষকের।

বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশনের আওতায় ২০০৫ সালে বেসরকারি শিক্ষকপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের এবং ১৯৯০ সালে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের যাত্রা। এই দুটি ফান্ডের জন্য শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রতি মাসে বেতনের ৬ শতাংশ ও ৪ শতাংশ কেটে রাখা হয়।

কেন দুই বছরেও মিলছে না টাকা । খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে যারা আবেদন করেছিলেন তারা তাদের অবসরের টাকা পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত ২২ হাজার ৪৩৩ জন শিক্ষকের আবেদন জমা আছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত যারা আবেদন করেছেন তারা অতি শিগিগর টাকা পাবেন বলে জানিয়েছেন অবসর সুবিধা বোর্ডের কর্মকর্তারা।

২০১৮ সালের জুন থেকে চলতি মাস পর্যন্ত জমা থাকা ১৯ হাজার ৩১২ জন শিক্ষককে অবসরের টাকা দিতে মোট প্রয়োজন হবে ২ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। হিসাব কষে দেখা যায়, শিক্ষকরা অবসর সুবিধা খাতে প্রতি মাসে ৬ শতাংশ হারে অর্থ জমা দেন সে হিসাবে প্রায় পৌনে ৫ লাখ শিক্ষক কর্মচারীর কাছ থেকে প্রতি মাসে আদায় হয় ৬০ কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে ৮৩৩ জন শিক্ষক অবসরের টাকা পেতে আবেদন করেন। এত সংখ্যক শিক্ষককে অবসর সুবিধার টাকা দিতে প্রয়োজন ১০৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান থেকে অবসর সুবিধা বোর্ডের ফান্ডে এফডিআর হিসাবে রয়েছে ৬১০ কোটি টাকা। এই অর্থ ব্যাংকে গচ্ছিত রাখায় বছরে পাওয়া যাচ্ছে ৩৬ কোটি টাকা। যা মাসে ৩ কোটি টাকা। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি মাসে ঘাটতি ৪২ কোটি। যা বছরে গিয়ে দাঁড়ায় ৫০৪ কোটি টাকা।

অবসর সুবিধা বোর্ডের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ সাদী বলেন, শিক্ষকদের দুঃখ কষ্টের বিষয়টি আমরা অনুধাবন করছি। বর্তমানে যে সংখ্যক আবেদন রয়েছে সবাইকে সুবিধা দিতে ২ হাজার কোটিরও বেশি টাকার প্রয়োজন। আমরা এই বছর অন্তত ১২ হাজার শিক্ষকের আবেদন নিষ্পত্তি করতে চাই। এ কারণে সরকারের কাছে ১ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছি। পাওয়া গেলে শিক্ষকদের দুঃখকষ্ট থাকবে না।

অন্যদিকে কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পেতে এখনো আবেদন জমা আছে ২০ হাজারের বেশি। প্রতি মাসে ৮০০ আবেদন জমা হয়। যা নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন হয় ৪৩ কোটি টাকা। প্রতি মাসে ৪ শতাংশ শিক্ষকরা জমা দেন। সে হিসাবে প্রতি মাসে আদায় হয় ৩৮ থেকে ৪০ কোটি টাকা।

ট্রাস্টের সদস্য সচিব শাহজাহান আলম সাজু বলেন, শিক্ষকদের সুবিধার জন্য অনলাইনে আবেদন জমা নেওয়া হয়। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্কের (এএফটিএন) মাধ্যমে শিক্ষকদের কাছে টাকা পৌঁছে যায়। তবে সংকট হলো আমাদের ২০ হাজারের বেশি আবেদন জমা আছে। দেড় হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ পাওয়া গেলে এই আবেদন করা শিক্ষকদের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।