সরকারি ক্রয়ে ই-জিপি (ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) প্রবর্তনের ফলে ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর হলেও কার্যাদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ, সিন্ডিকেট এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলছে, ই-জিপির ক্রয়াদেশ পর্যন্ত এর ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা, সব ধরনের ক্রয়ে ই-জিপি ব্যবহার না হওয়া এবং ই-জিপি প্রবর্তনের ফলে ম্যানুয়াল থেকে কারিগরি পর্যায়ে সরকারি ক্রয়ের উত্তরণ ঘটলেও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের একাংশ দুর্নীতির নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে।
গতকাল বুধবার ‘সরকারি ক্রয়ে সুশাসন : বাংলাদেশে ই-জিপির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করা হয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা থেকে উত্তরণ এবং ই-জিপির কার্যকর সুফল পেতে ১৩ দফা সুপারিশ প্রদান করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : ই-জিপিকে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ ও সিন্ডিকেটের দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করতে হবে। সেই লক্ষ্যে সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও জনগুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যাবসায়িক সম্পর্কের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। প্রাক-দরপত্র মিটিং নিশ্চিত করতে হবে। ঠিকাদারদের অনলাইন ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। সমন্বিত স্বয়ংক্রিয় দরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকতে হবে। ই-জিপির সঙ্গে জড়িত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিজস্ব ও পরিবারের অন্য সদস্যদের আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রতিবছর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে ও তা প্রকাশ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ই-জিপির ফলে ক্ষেত্রবিশেষে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাজের মানোন্নয়নে এর কোনো প্রভাবই পড়েনি। ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং কার্যকারিতার মতো তিনটি মৌলিক ক্ষেত্রেই অবস্থান উদ্বেগজনক। সার্বিকভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। এর পেছনে মূলত রাজনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশে রাজনীতিকে সম্পদ বিকাশের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। যা থেকে সরকারি ক্রয় খাতও মুক্ত নয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই গবেষণায় তথ্য সংগ্রহের জন্য ই-জিপি বাস্তবায়নকারী প্রথম দিকের চারটি প্রতিষ্ঠান—স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (আরইবি) বাছাই করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, ই-জিপি প্রক্রিয়া, ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং কার্যকারিতা—এই পাঁচটি ক্ষেত্রের অধীনে ২০টি নির্দেশকের ভিত্তিতে সরকারি ক্রয় আইন কতটুকু কার্যকর তা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় যে, অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে ৫০ শতাংশ স্কোর পেয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ)। ৪৪ শতাংশ স্কোর পেয়েছে পল্লী বিদ্যুত্ (আরইবি), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ৪৩ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পেয়েছে ৪২ শতাংশ অর্থাত্ কোনো প্রতিষ্ঠানের অবস্থানই ‘ভালো নয়’ গ্রেডে। সবগুলো প্রতিষ্ঠানই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশ স্কোর পেয়ে মোটামুটি ভালো ও প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে আছে, তবে সওজ ও আরইবির সক্ষমতা অন্য দুটো প্রতিষ্ঠান থেকে তুলনামূলকভাবে ভালো। ই-জিপি প্রক্রিয়া মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই ৫৮ থেকে ৬৪ শতাংশ স্কোর পেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ই-জিপি ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকারিতায় কোনো প্রতিষ্ঠানই কোনো স্কোর পায়নি। আবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে সব প্রতিষ্ঠানের স্কোর ১৯ থেকে ৩০ শতাংশ অর্থাত্ হতাশাব্যঞ্জক।