প্লাস্টিকে কোণঠাসা মৃিশল্প!

জয়নুল আবেদীন স্বপন

 

ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের মধ্যে মৃিশল্প একটি। বর্তমান সময়ে মাটির জিনিসের ব্যবহার কমে যাওয়ায় মৃিশল্পের কারিগররা অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে। কিছু কিছু কারিগর বংশপরম্পরায় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সিলভার, প্লাস্টিক, মেলামাইন সামগ্রীর উত্পাদন ও ব্যবহারের কারণে মৃিশল্প চরম হুমকির সম্মুখীন। বর্তমানে যাঁরা এ পেশায় আছেন তাঁদের সন্তানদের মধ্যে মৃিশল্পী হওয়ার আগ্রহ কম। তারা লেখাপড়া শিখে অন্য পেশা গ্রহণ করতে চায়।

এক সময় কুমারখালির তৈরি মৃিশল্পের সুনাম ছিল দেশব্যাপী। মৃিশল্পের জন্য গাজীপুরও এক সময় বিখ্যাত ছিল। গাজীপুরে হাজার হাজার শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠায় মৃিশল্পের কাঁচামাল এঁটেল ও দোঁআশ মাটি সংগ্রহ করতে কুমারদের বেশি টাকা খরচ করতে হয়। মাটির অভাব থাকায় বেশি টাকায় কারিগরেরা মাটি কিনতে চান না। প্লাস্টিক ও পলিথিনের বর্জ্যে মাটিদূষণ বেড়ে যাওয়ায় মৃিশল্পের প্রধান উপকরণ পরিষ্কার এঁটেল মাটি সংগ্রহ করা কঠিন। এঁটেল মাটি আঠালো বলে ছানা বানানো সহজ। সাদা মাটি দিয়েও শৌখিন সামগ্রী তৈরি হয়। কুমার সম্প্রদায়ের বাইরেও অনেক মৃিশল্পী রয়েছে। কুমাররা মৃত্পাত্র তৈরিতে যে চাকা ব্যবহার হয় তা নিজেরাই তৈরি করেন। মেয়েরাও কাজে সহযোগিতা করে।

আগে ঘরে ঘরে নানা তৈজসপত্র ছিল মাটির তৈরি। এক সময় কুমাররা কেবল গৃহস্থালির ব্যবহার্য মৃত্পাত্র তৈরি করত। মাটির হাঁড়ি-পাতিল, সরা, কলস, সানকি, গামলা, বাটি, টব, মুড়ি বনানোর ঝাকর/ঝাঝর, জলকান্দা, ঘড়া, মাটির ব্যাংক ইত্যাদি ছিল মাটির। মাটির মূর্তি ছাড়াও হাতি, ঘোড়া, বাঘ, সিংহ, হরিণ, মাছ, পুতুল, ফুলদানি, খেলনা সামগ্রীও মাটির তৈরি। সহজে হাতের কাছে পাওয়া যায়। মটির কলসের পানি সবসময় ঠান্ডা থাকে। এ পানির স্বাদ আলাদা। কম টাকা খরচ করে শৌখিন মধ্যবিত্তরা ঘর সাজানোর কাজে ব্যবহার করে মাটির জিনিস। বর্তমানে মাটির তৈরি শৌখিন সামগ্রী কম টাকায় বেশি কেনে মানুষ। বাঙালির ঐতিহ্য ও গর্বের মৃিশল্প বর্তমানে কুটিরশিল্প হিসাবে গুরুত্ব লাভ করেছে। বৈশাখিমেলা ও বিভিন্ন উত্সবে মাটির তৈরি শৌখিন জিনিস কিনতে মানুষ ভিড় করে। পোষা পাখির বাসার জন্য মাটির পাত্র ব্যবহার হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখিদের বংশবৃদ্ধির জন্য গাছে গাছে হাজার হাজার পাত্র বেঁধে দিচ্ছে কিছু সচেতন মানুষ।

অথচ আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃিশল্প। বাপ-দাদার পেশাকে ধরে আছে অনেক মৃিশল্পী। তাদের সাহস ও উত্সাহ জোগাতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপনের জন্য প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার বন্ধ করে মাটির তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহার করা উচিত। প্লাস্টিক পণ্যে কোণঠাসা মৃিশল্প। মৃিশল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। পরিবেশবান্ধব মৃিশল্প গৌরবময় ঐতিহ্য। তরুণ উদ্যোক্তাদের এ পেশায় আগ্রহী করে তুলতে হবে। প্রয়োজনে এই শিল্পে আগ্রহীদের জন্য ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মৃিশল্পের প্রশিক্ষণ ও চর্চা শুরু হোক আবার। নতুন করে মৃিশল্পের কদর বাড়ুক দেশজুড়ে।

গাজীপুর