চাল উত্পাদনে বাড়তি নজর

দেশের জনসংখ্যা ২৫ কোটিতে গিয়ে পৌঁছলে ৪ কোটি ৮০ লাখ টন চালের প্রয়োজন হবে। এই পরিমাণ চাল উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েই গবেষণা করছে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। গবেষণায় সাফল্য পেতে নানামুখী কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে কৃষি বিভাগ। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, চাল উত্পাদনের লক্ষ্য পূরণে প্রতি বছর ৪৪ কেজি/হেক্টর হারে উত্পাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ফলন পার্থক্য ও জাতগুলোর সম্প্রসারণে দীর্ঘসূত্রতা কমানো হবে। আউশ এলাকার মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নদীর পানি ব্যবহারের মাধ্যমে ধানের আবাদ এলাকা বৃদ্ধির বিষয়টিকেও। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ এই তিন মেয়াদে ৩৭টি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চিন্তাভাবনা চলছে। 

ধান বিজ্ঞানীরা বলছেন, টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি, পানি, কৃষিশ্রমিক এবং মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তন। দেশে ধানের জমির পরিমাণ প্রতি বছর ০.৪০ শতাংশ হারে কমে যাবার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষ দুধ-ডিম ও মাংসসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার কিনতে না পারলেও ভাত নিয়মিত খেতে পারছে। তাই ভাতের মাধ্যমে কীভাবে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা যায় সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন তারা। জিংকসমৃদ্ধ ধানের পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টি উপাদান যেমন—প্রোটিন, আয়রন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, প্রো-ভিটামিন সমৃদ্ধ এবং লো-জিআই ধানসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর ধান উদ্ভাবন করা হয়েছে। শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানগুলো দেহের প্রয়োজন অনুসারে চালে সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় জাতসমূহ যেমন—বিরই, টেপি বোরো, রাতা বোরো, বালাম, কাটারিভোগ, কৃষ্ণভোগ, রাণীস্যালুট থেকে উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনে কাজ করছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। পুষ্টিসমৃদ্ধ ও নিরাপদ ধানের জাত উদ্ভাবনে বিশ্বের সর্বাধুনিক বায়োফর্টিফিকেশন ও জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। কৃষি উন্নয়নে ন্যানোপ্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই দমন, সার ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। ধানের উত্পাদন ও রোগবালাই দমনে ন্যানো ফার্টিলাইজার ও ন্যানো পেস্টিসাইডের প্রভাব নিয়ে এরই মধ্যে গবেষণা শুরু হয়েছে।

হিসাব কষে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০৩০, ২০৪১ এবং ২০৫০ সালে যথাক্রমে ১৮ কোটি ৬০ লাখ, ২০ কোটি ৩ লাখ এবং ২১ কোটি ৫০ লাখ লোকের খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল প্রয়োজন হবে যথাক্রমে ৩ কোটি ৮৫ লাখ টন, ৪ কোটি ২০ লাখ টন এবং ৪ কোটি ৪৬ লাখ টন। আপাতত সেদিকে লক্ষ্য রেখেই ব্রির গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

চালের উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে :ধান গবেষণার জাতগুলো মাঠ পর্যায়ে জনপ্রিয় করা। হেক্টর প্রতি উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ। হাইব্রিড জাত ও ইনব্রিড জাত উদ্ভাবনের জন্য স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানো, সেচসাশ্রয়ী এবং বৃষ্টিনির্ভর পরিবেশের জন্য স্বল্প ও নাতিদীর্ঘ জীবনকাল সম্পন্ন ধানের জাত এবং টেকসই উত্পাদন প্রযুক্তির উদ্ভাবন।

ছয় বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, বৃষ্টিনির্ভর আউশ ও রোপা আমন গবেষণা কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা, জিন সংযোজন এবং ক্রপমডিলিং প্রযুক্তি মাধ্যমে ফলনের সীমাবদ্ধতা দূর করা, স্থানীয় জনপ্রিয় জাতগুলো আধুনিকায়নের মাধ্যমে ফলন বাড়ানো। এছাড়া হাইব্রিড ধানের জাত উদ্ভাবন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিবেচনায় রেখে বিশেষ করে আকস্মিক বন্যা, ঠান্ডা ও খরাপ্রবণ এলাকার জন্য অভিনব ফসল ব্যবস্থাপনা  পদ্ধতি উদ্ভাবন।

৯ বছর ও তদুর্ধ্ব মেয়াদি কর্মপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—নতুন প্ল্যান্ট টাইপ, সুপার হাইব্রিড ধান উদ্ভাবন। রোগ ও পোকা ব্যবস্থাপনার টেকসই প্যাকেজ উদ্ভাবন এবং প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনের জন্য জিন পিরামিডিং পদ্ধতি অনুসরণ করা। পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং পানিসাশ্রয়ী স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন। টেকসই ফসল ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন, পরিবর্তিত জলবায়ু উপযোগী কৃষকের জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক ধানভিত্তিক শস্যক্রম উদ্ভাবন।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ১০৩টি উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক শাহজাহান কবীর বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চালের উত্পাদন প্রতি বছর গড়ে ৪.৮৮ লাখ টন হারে বেড়েছে এবং উত্পাদন বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত আছে। প্রতি বছর দেশে ২২ লাখ লোক যোগ হচ্ছে, যাদের খাওয়াতে আমাদের অতিরিক্ত ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টন চালের প্রয়োজন হয়। তাই নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করে প্রতিনিয়ত পুরাতন জাতকে রিপ্লেস করার মাধ্যমে চাল উত্পাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে।