ফুটপাত থেকে আড়াই কোটি টাকার চুক্তি

মাত্র বছর দশেক আগের গল্প।

মুম্বাইয়ের এক দোকানে কাজ করত ছেলেটি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করে নিজের থাকা-খাওয়ার টাকা জোগাড় করত। কোনোক্রমে মাথা গোঁজার যে ঠাঁই ছিল, সেটাও হঠাত্ হারিয়ে গেল। ফুটপাত তার ঠিকানা হয়েছিল। দুনিয়ার কেউ সম্ভবত এমন একটা ভবঘুরে, ছিন্নমূল ছেলের ওপর বাজি রাখতে রাজি ছিল না।

দুনিয়ার খেলা বোঝা বড় কঠিন! সেই ছেলেটিই আজ কোটিপতি!

সেদিন রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, দোকানে কাজ করা সেই জশস্বী জসওয়াল এখন রাজস্থান রয়্যালসের খেলোয়াড়। একটি-দুটি টাকা নয়, ৩ লাখ ২৭ হাজার মার্কিন ডলার, মানে আড়াই কোটিরও বেশি বাংলাদেশি টাকায় জসওয়ালকে দলে ভিড়িয়েছে আইপিএল দল রাজস্থান। আর এমন জসওয়ালের গল্প বুকে নিয়েই আজ থেকে আরব আমিরাতে শুরু হচ্ছে আইপিএলের ১৩তম আসর।

উত্তর প্রদেশের সুরাইয়াতে জন্ম জসওয়ালের। বাবা নিজে ছিলেন অপেশাদার ক্রিকেটার। স্বপ্ন ছিল ছেলেকে ক্রিকেটার বানাবেন। মাত্র তিন বছর বয়সেই ছেলের হাতে তাই ব্যাট তুলে দিয়েছিলেন। জসওয়ালও জ্ঞান হতেই শচীন টেন্ডুলকারের মতো ব্যাটসম্যান হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।

মূলত ছেলের স্বপ্ন পূরণ করতেই বাবা ভুপেন্দ্র তাকে নিয়ে চলে এলেন মুম্বাইতে। ভুপেন্দ্র শুনেছিলেন, এখানে এলে ক্রিকেটার বানানো যাবে ছেলেকে। কিন্তু এখানেই আসল লড়াইটা শুরু হলো।

এক দূর-সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায় উঠেছিলেন বাবা-ছেলে। সেই আত্মীয়ও নিতান্ত গরিব। এক ঘরে ছয়-সাত জন মানুষকে থাকতে হচ্ছিল। এই অবস্থা বেশি দিন মেনে নিতে পারলেন না জসওয়াল। বাসাটা ছেড়ে দিলেন।

বাবা দেশে ফিরে গেলেন। তার সামর্থ্য ছিল না ছেলেকে মুম্বাইতে রেখে ক্রিকেট খেলানোর। সুতরাং জসওয়াল নিজেই নিজের পথ তৈরি করে নিতে শুরু করলেন। একটা দুগ্ধজাত পণ্যের দোকানে চাকরি শুরু করলেন। এখানে টানা সাত-আট ঘণ্টা কাজ করার পর দক্ষিণ মুম্বাইয়ের এক মাঠে খেলতে যেতেন।

এখানেই এক কোচের নজরে পড়ে গেলেন। আর সেই কোচ একটা থাকার জায়গা করে দিলেন। কিছুদিন সেখানে থাকার পর গ্রাউন্ডসম্যানদের সঙ্গে তাদের তাঁবুতে বসবাস শুরু করলেন জসওয়াল।

এদিকে পরিবার থেকে বারবার খবর আসত, এত কষ্ট না করে বাড়ি চলে আসার জন্য। জসওয়াল তার জায়গায় অবিচল ছিলেন। ক্রিকেট খেলতে কিছু খরচ হতো। সেটা মেটানোর জন্য ফুটপাতে খাবার বিক্রি শুরু করলেন সন্ধ্যার পর।

অবশেষে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। ২০১৩ সালে ১২ বছর বয়সি জসওয়ালকে তার অসাধারণ ব্যাটিংয়ের কারণে পছন্দ করে ফেললেন কোচ জাওলা সিং। তিনি একাডেমিতে নিয়ে গেলেন এই কিশোরকে। সেখানে তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ২০১৫ সালে জাইলস শিল্ড ক্রিকেটে দারুণ অলরাউন্ড পারফরম্যান্স করে নিজেকে চিনিয়ে ফেললেন। এরপর পথটা পাড়ি দিতে আর পিছু তাকাতে হয়নি। মুম্বাই অনূর্ধ্ব-১৬ দল হয়ে ভারতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলেও চলে এলেন। ভারতীয় যুবদলের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গত বিশ্বকাপেই ফাইনাল খেললেন।

একদিন রাজস্থান রয্যালসে ট্রায়াল দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরেছিলেন। সেই জসওয়ালকে ২০২০ সালে এসে খুঁজে বের করল সেই রাজস্থান দলই। তারাই তাকে কোটি টাকার ক্লাবে নিয়ে গেল।

এই অসাধারণ যাত্রার দিকে চেয়ে জসওয়াল শুধু বলেন, ‘বিশ্বাস’। নিজের ও ভাগ্যের ওপর বিশ্বাসই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।