প্রতিদিন কালো ধোঁয়া পুরো এলাকা আচ্ছাদিত করে রাখে। রোদ ঝলমলে দিনেও এলাকায় আঁধার নেমে আসে। দরজা-জানালা খোলা রাখার কোনো উপায় থাকে না। ধোঁয়ার কারণে বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অফিসে কালির স্তর পড়ে গেছে। শুধু ধোঁয়াই নয়, অনেক কারখানা থেকে কেমিক্যাল মিশ্রিত রং-বেরঙের পানি নালা-নর্দমা দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। প্রবল বৃষ্টির সময় নালা-নর্দমা উপচে পড়া দূষিত পানি সড়ক বেয়ে যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়ে। যা মানুষের সংস্পর্শে আসে। এতে করে মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে মানুষ।
বলছিলেন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকা চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ শিল্প এলাকার কয়েক জন বাসিন্দা। শিল্পকারখানার কারণে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের কবলে এখন বন্দরনগরীর এই এলাকা। বায়েজিদ থানাধীন নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা ও তার আশপাশে মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যম স্কুল-কলেজ এবং অনেক আবাসিক এলাকা ও বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। শিল্প এলাকায় কয়েকটি ভারী শিল্পকারখানা ও অসংখ্য গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে ক্রমান্বয়ে এলাকাটি শিল্প, আবাসিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে একটি মিশ্র এলাকায় পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, এই মিশ্র এলাকায় কতিপয় শিল্পকারখানার অতিমাত্রায় পরিবেশ দূষণের কারণে গার্মেন্টসসহ অন্য শ্রমঘন শিল্পকারখানার শ্রমিক-কর্মচারীসহ সব পর্যায়ের মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। শিল্পকারখানায় মানসম্মত দূষণরোধী কোনো আধুনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় বিষাক্ত ধোঁয়া অবাধে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল ও মেটাল কণামিশ্রিত বিষাক্ত ধোঁয়া প্রতিনিয়ত মানুষের শরীরের প্রবেশ করছে। যা শরীরে মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকার পুরনো প্রযুক্তির কয়েকটি রি-রোলিং এবং স্টিলমিল থেকে সবচেয়ে বেশি দূষণ সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া কয়েকটি টেক্সটাইল, ওয়াশিং কারখানাসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল ও অন্যান্য পণ্য উত্পাদনকারী কারখানা দূষণের জন্য দায়ী। চট্টগ্রামস্থ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নূরী জানান, স্টিলমিলসহ কয়েকটি ভারী শিল্পকারখানা থেকে বেশি দূষণ ছড়ায়। ইতিপূর্বে তাদের একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে জরিমানা করা হয়েছে। তারা তাদের ধোঁয়া ফিল্টার করে ছাড়ার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বলে জানিয়েছিল। কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে দেখা হবে।
জানা যায়, এসব স্টিলমিলে স্ক্র্যাপ গলানোর সময় ধোঁয়ার সঙ্গে কার্বন, আয়রন, অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন পার্টিকেল নিঃসরণ হয়। যা মানুষের নাক, মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশের ফলে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়। বর্তমানে দেশের বড় বড় কয়েকটি স্টিলমিল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ধোঁয়াকে ফিল্টার করে ফেলে। এতে থাকা মেটাল কণাসমূহ বের করে জমা করা হয়। পরবর্তীতে তা চীনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এক সময় নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা স্বতন্ত্র এবং চট্টগ্রাম শহর থেকে অনেকটা দূরবর্তী শিল্প এলাকা ছিল। কিন্তু বর্তমানে শহরের ব্যাপক বিস্তৃতির ফলে নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা নগরীর মাঝামাঝি এলাকায় পড়ে গেছে। এর চারপাশে বসতি গড়ে উঠেছে। তাই যুগের চাহিদার কারণে এই শিল্প এলাকায় থাকা কারখানাসমূহ পর্যায়ক্রমে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়াটা সবচেয়ে উত্তম কাজ হবে বলে নগর পরিকল্পনাবিদদের অভিমত।