দেশি পেঁয়াজ বাজারে ছাড়ছে না মজুতদাররা

ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করায় সংকট তৈরি হলেও বেশি লাভের আশায় দেশি পেঁয়াজ বাজারে ছাড়ছেন না মজুতদাররা। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ না থাকায় চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটি।

কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে,  দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ লাখ টন। এই হিসেবে প্রতি মাসে গড়ে পেঁয়াজের চাহিদা ২ লাখ টনের কিছু বেশি। আগামী ফেব্রুয়ারির আগে দেশে উত্পাদিত নতুন পেঁয়াজ পুরোপুরি বাজারে উঠবে না। তাহলে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি চার মাসে পেঁয়াজের চাহিদা ৮ লাখ ৩০ হাজার টন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে, বর্তমানে দেশে ৫ থেকে ৬ লাখ টন পেঁয়াজের মজুত রয়েছে। এ হিসেবে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন। কিন্তু এই সাড়ে ৩ লাখ টন পেঁয়াজতো এখনই লাগছে না। তাহলে ভারত রপ্তানি বন্ধ করলে এক লাফে পেঁয়াজের কেজি ৬০ থেকে ১০০ টাকা হবে কেন, এই প্রশ্ন এখন ক্রেতাদের?

দেশে পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ি, মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, ঝিনাইদহ, মাগুরা, মেহেরপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, দিনাজপুর ও রংপুরে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ উত্পাদন হয়। কিন্তু ভারতের রপ্তানি বন্ধের পর এই জেলাগুলোর পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ কমে গেছে।

পেঁয়াজ আমদানিকারক মোরশেদুর রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, প্রতি বৃহস্পতিবার পাবনায় পেঁয়াজের বড় হাট বসে। কিন্তু রপ্তানি বন্ধের পর গত বৃহস্পতিবার পাবনার এই হাটে পেঁয়াজের সরবরাহ অনেক কমে গেছে। তিনি বলেন, দেশি পেঁয়াজের মজুতদাররা বেশি লাভের আশায় পেঁয়াজ ছাড়ছে না। তারা মনে করছে, গত বছরের মতো এবারও পেঁয়াজের কেজি ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে!

গতকাল কাওরান বাজারের পাইকারি পেঁয়াজ বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, মোকামগুলোতে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ অনেক কম। এজন্য দাম বেশি। তবে পাইকারি বাজারে নতুন করে পেঁয়াজের দাম আর বাড়েনি।

গতকাল রাজধানীর পাইকারি বাজারে প্রতি পাল্লা (পাঁচ কেজি) দেশি পেঁয়াজের দর ছিল ৪১০ থেকে ৪২০ টাকা। যা আগের দিনের চেয়ে প্রতি পাল্লায় ১০ টাকা কম। এই হিসেবে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮২ থেকে ৮৪ টাকায়। আর আমদানি করা প্রতি পাল্লা পেঁয়াজের পাইকারি দর ছিল ৩১০ থেকে ৩২০ টাকা। এই হিসেবে প্রতি কেজির দাম পড়ে ৬২ থেকে ৬৩ টাকা। তবে পাইকারি বাজারে দর কিছুটা কমলেও খুচরা বাজারে আগের মতোই চড়া দরে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ। গতকাল খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৯০ থেকে ১১০ টাকা ও আমদানিকৃত পেঁয়াজ মানভেদে ৭০ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হয়।

হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ ঢুকছে আজ

দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের ভারতীয় সীমান্তে আটকে থাকা আগের এলসি করা পেঁয়াজ আজ শনিবার দেশে ঢুকবে বলে জানা গেছে। ইত্তেফাকের হাকিমপুর (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জাহিদুল ইসলাম জানান, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের ব্যবসায়ীরাই এ বিষয়ে ইতিবাচক কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে ভারতের বালুরঘাটের রপ্তানিকারক রামনাথ সাহা গতকাল ইত্তেফাককে জানান, ভারতের সীমান্তে আটকে থাকা পেঁয়াজের তথ্য তারা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। আশা করছি, শনিবার সকালের দিকে এ পেঁয়াজ ছেড়ে দেওয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন-উর-রশিদ বলেন, ভারতীয় সীমান্তে আমাদের ২০০টন পেঁয়াজ আটকে আছে। রপ্তানি বন্ধের আগে এসব পেঁয়াজের এলসি করা হয়েছিল। ভারতের ব্যবসায়ীরা আমাদের জানিয়েছেন, শনিবার এসব মাল ঢুকবে। তবে তিনি বলেন, গত পাঁচ/ছয় দিন ট্রাকে আটকা থাকায় অনেক পেঁয়াজ ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। তারপরও এসব পেঁয়াজ দেশে ঢুকলে বাজারে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে।

অন্য দেশ থেকেও আসছে পেঁয়াজ

ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করায় দেশের আমদানিকারকরা গত বছরের মতো এবারও চীন, মিয়ানমার, মিশর ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে তারা উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র থেকে অনুমতিপত্র সংগ্রহ করেছেন। প্রথম পর্যায়ে এই দেশগুলো থেকে ৫০ হাজার টন পেঁয়াজ আসছে। এছাড়া তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খুলেছে সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। সংস্থাটি তুরস্ক থেকে ১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করবে।

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক পেঁয়াজ আমদানির এলসির (ঋণপত্র) সুদ হার ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার নির্দেশনা দেওয়ায় পেঁয়াজের আমদানি বাড়বে। এতে শিগিগর পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল হবে। পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারণের এই নির্দেশনা চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।